জাতীয় বরিশাল

আবাসন আগ্রাসনে কুয়াকাটায় মাইলের পর মাইল কৃষি জমি অনবাদী

kalapara-01 (03-09-13) 02মেজবাহউদ্দিন মাননু, কুয়াকাটা থেকে ০৩ সেপ্টেম্বর : পর্যটন এলাকা কুয়াকাটায় ল্যান্ডজোনিংএর কাজ পুরোপুরি শেষ না হতেই অন্তত দশ হাজার একর কৃষিজমি কৃষকের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এসব জমির অন্তত এক তৃতীয়াংশ এখন স্থায়ীভাবে পতিত হয়ে গেছে। একারণে এখানে প্রতিবছর অন্তত ছয় হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের উৎপাদন কম হচ্ছে। চারটি বছর ধরে এই অবস্থা শুরু হয়েছে। ক্রমশ অনাবাদী জমির পরিমাণ বাড়ছে। এছাড়া কয়েক কোটি টাকার রবিশস্যসহ শাকসবজির আবাদ বন্ধ হয়ে গেছে। কুয়াকাটায় প্রতি বছর শুধুমাত্র কয়েক কোটি টাকার তরমুজের আবাদ হতো। যা এখন হয় না বললেই চলে। আবাসন আগ্রাসনে সাগরপারে কৃষিক্ষেত্রে মানুষসৃষ্ট এমন বিপর্যয় যেন ক্রমাগত বেড়েই চলছে। এভাবে কুয়াকাটা পর্যটন এলাকা ছাড়া এর আশপাশের ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকার অধিকাংশ কৃষিজমি কৃষকের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। লতাচাপলী ইউনিয়নের খাজুরা থেকে পর্যটনপল্লী গঙ্গামতি এবং কাউয়ারচর পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকায় এমনচিত্র বিদ্যমান রয়েছে। কৃষিকাজে ব্যবহারের অন্তত পাঁচ হাজার একর জমি পতিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনে দ্বিগুন উদ্ধৃত্ত কলাপাড়া এখন খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি পড়ার আশঙ্কা হয়েছে। কৃষকের মালিকানা অন্তত পাঁচ হাজার একর কৃষি জমির মালিক বনে গেছে এক শ্রেণীর আবাসন ব্যবসায়ীসহ জমি বেচাকেনার দালালরা। যদিওবা এখন পর্যন্ত অর্ধেক জমিতে হালচাষের কাজ চলছে। কিন্তু মালিকানা পাল্টে গেছে।

জমির মালিকানা বদল প্রক্রিয়া শুরু হয় ৬/৭ বছর আগে। কিন্তু এসব জমিতে এখন পর্যন্ত কোন ধরনের স্থাপনা তোলা হয় নি। তবে কুয়াকাটা পৌর এলাকাসহ তার আশেপাশের জমির চারদিকে দেয়াল কিংবা পিলার দেয়া হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে ওইসব জমিতে হালচাষ। ধানসহ কৃষিউৎপাদন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি এসব এলাকার কৃষকসহ হাইলা-কামলা এবং কৃষি শ্রমিকরা হারিয়েছে তাদের কর্মক্ষেত্র। এসব এলাকার মানুষ ৫/৭ বছর আগে তাদের উৎপাদিত ধানসহ রবিশস্য নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফলন এলাকার বাইরে বিক্রি করত। অথচ বর্তমানে নিজেদের বছরের খোরাকি চাল পর্যন্ত এলাকার বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। সব ধরনের খাদ্য সামগ্রীর জন্য এলাকার বাইরের হাট-বাজার কিংবা মোকামের দ্বারস্থ হতে হয়। মোট কথা কৃষিনির্ভর এই এলাকায় এখন কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে চাষাবাদ হচ্ছে এসব জমির মধ্যেও বিভিন্ন আবাস কোম্পানির অসংখ্য সাইবোর্ড শোভা পাচ্ছে। কলাপাড়া উপজেলার ২০১১ সালের ল্যান্ডজোনিং রিপোর্ট অনুসারে উপজেলার লতাচাপলী এবং ধুলাসার ইউনিয়নে মোট জমির পরিমাণ ২৫ হাজার দুই ’শ ৭৩ একর। এর মধ্যে কৃষি জমির পরিমাণ ১৩ হাজার চার ’শ ৪১ একর। বর্তমানে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার অবস্থান লতাচাপলী ইউনিয়নে এবং পর্যটনপল্লী গঙ্গামতির অবস্থান ধুলাসার ইউনিয়নে।

অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, লতাচাপলী ইউনিয়নের পশ্চিম খাজুরা গ্রাম থেকে গত পাঁচ বছরে অন্তত ৫০টি কৃষক ও জেলে পরিবার এখান থেকে বাড়িঘরসহ চাষের জমি বিক্রি করে চলে গেছে অন্যত্র। শুধু পশ্চিম খাজুরা নয়। একই দৃশ্য মাঝিবাড়ি, মিরাবাড়ি, পশ্চিম কুয়াকাটা, কুয়াকাটা, কেরানিপাড়া, নবীনপুর, শরীফপুর, মম্বিপাড়া, হুইচেনপাড়া, বড়হরপাড়া, মম্বিপাড়া, গঙ্গামতি, ধুলাসার, নতুনপাড়া, কাউয়ারচর, বটতলাসহ সর্বত্র। হাজার হাজার একর জমিতে এখন দাড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড। পাঁচ বছর আগের দেখা মানুষের কাছে এই দীর্ঘ এলাকা এখন অপরিচিত মনে হয়। যেন স্থায়ীভাবে অনাবাদী হয়ে পড়ছে মাইলের পর মাইল এলাকার কৃষি জমি। ফলে অন্তত ৫০ হাজার মানুষের খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যেভাবে কৃষি জমি দ্রুত অনাবাদী হচ্ছে তাতে সাগর পারের কৃষি জনপদ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে না দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সেখানে কী পরিমান কৃষি জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। খাজুরা বাঁধের স্লোপে ছোট্ট দোকানি মোঃ ফরহাদ হোসেন। বয়স প্রায় ৬০ বছর। প্রায় দেড়যুগ ছোট্ট ব্যবসার পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। এখন চাষাবাদ করে সবজি রবিশস্য আবাদের জমি তার নেই। বাড়ি সংলগ্ন এলাকা হাউজিং কোম্পানি ইয়েস বাংলা কৃষি জমি কিনে সাগর থেকে লোনা পানি মিশ্রিত বালু দিয়ে ভরাট করায় তাদের এমন সর্বনাশ হয়েছে। ওই বালু পানিতে তাদের বাড়ি-ঘর পর্যন্ত আটকে পড়ে। শুকনো মৌসুমে পুকুর খাল সব লোনা পানিতে একাকার হয়ে গেছে। এখন গোটা এলাকার কৃষি জমি দেখলে মনে হয় যেন বিরাণ ভুমিতে পরিণত হচ্ছে। অথচ চার/পাঁচ বছর আগেও এই বিশাল এলাকাজুড়ে ধানের পাশাপাশি তরমুজ, ডাল জাতীয় ফসলের বাম্পার ফলন হতো। জানা গেলে, ইয়েস বাংলা ছাড়াও ইউনিক কোম্পানি প্রায় ১০ একর, সাগর নীড় প্রকল্পের বিরাট এলাকা তিন বছর ধরে অনাবাদি পড়ে আছে। ওই এলাকা থেকে ইতোমধ্যে ওয়াজেদ খান, শামসুল হক, মুনসের, ফজু হাওলাদার, মোসলেম আলী, কালামসহ বহু কৃষক তাদের জমিজমা বিক্রি করে পাশের তালতলীসহ বিভিন্ন স্থানে চলে গেছে। ওই এলাকায় যারা রয়েছেন তারাও ভরাটের কারণে চাষাবাদ করতে পারছেন না। সুলতান ও এমাদুল জানালেন তারা নিজেরাই গত বছর তরমুজের আবাদ করতে পারেন নি। এখন আমন আবাদেও সমস্যা হচ্ছে। আকলিমা বেগম ও নুর মোহাম্মদ দম্পতি জানালেন, গত বছর তাদের ৬টি ছাগল মারা গেছে। খাস খাওয়ানোর মতো অবস্থাও নেই। সব বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। তাদের ভাষায় দুঃখের যেন শেষ নেই। ডোবার মিঠা পানিতে এসব মানুষ গোসল করত। করত রান্নাসহ থালাবাসন ধোয়ার কাজ। করত দিনভর মাঠে চাষাবাদ কিংবা সাগরে মাছ শিকার। এখন খালসহ ডোবা পর্যন্ত লোনা পানি মিশ্রিত বালু দিয়ে ভরাট করায় এসব মানুষের বসবাস যেন দুরুহ হয়ে পড়েছে । দুরের কোন গভীর নলকুপ একমাত্র ভরসা। মোট কথা চাষাবাদ তো দুরের কথা এখন হাজার হাজার শ্রমজীবি ও কৃষক পরিবারের বসবাসে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। স্থানীয় ইউপি মেম্বার ছোহরাব হোসেন জানান, হাজার হাজার একর কৃষি জমি হাউজিং কোম্পানি কিনে বাউন্ডারি করে ফেলে রেখেছে বছরের পর বছর। ফলে আমরা কৃষি উৎপাদন থেকে বঞ্চিত রয়েছি। এভাবে খাজুরা থেকে চরকাউয়া এবং গঙ্গামতি পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় কৃষি জমিতে এখন হাজার হাজার সাইনবোর্ড আর সাইনবোর্ড দাড়িয়ে আছে। এসব এলাকার শ্রমজীবি হাইলা-কামলা শ্রেণীর হাজার হাজার পরিবারও রয়েছে আবাসস্থল হারানোর আশঙ্কায়। এরা ইতোমধ্যে তাদের কর্মক্ষেত্র হারিয়ে ফেলছে।

বর্তমানে অধিকাংশ এলাকার কৃষিজমিতে আমন ধানের চারা রোপন করা শেষ পর্যায়ে। কিন্তু লতাচাপলী এবং কুয়াকাটায় ভিন্ন চিত্র। পড়ে আছে হাজার হাজার একর কৃষি জমি পতিত অবস্থায়। ২০১১ সালের ১৩ নবেম্বর ভূমি মন্তণালয়ের সচিব মোঃ মোখলেসুর রহমান কলাপাড়ায় ল্যান্ডজোনিং বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় স্পষ্ট করে বলেছেন কুয়াকাটায় হাউজিং কোম্পানির ব্যবসায় কোন ধরনের অনুমতি সরকারিভাবে দেয়া হয়নি। এছাড়া ভূমি সংক্রান্ত প্রচলিত আইনে বলা আছে কৃষি জমি কোন কৃষক ছাড়া হস্তান্তর করার সুযোগ নেই। আর কৃষি জমিতে আবাসন ব্যবসার কোন সুযোগ তো নেই। তারপরও কোন ধরনের নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করেই কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা পর্যটন এলাকাসহ সর্বত্র কৃষি জমি কিনে ভরাট করা হচ্ছে। সচেতন মানুষের দাবি এখনও স্থাপনা তোলার আগেই এসব কৃষি জমি রক্ষায় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। নইলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহতের আশঙ্কা রয়েছে।

সবুজের আস্তরণে ঢেকে থাকা সাগরপারের জনপদ পরিণত হতে যাচ্ছে যেন বিরানভূমিতে। এসব বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে গত বছর খাজুরা এলাকার সহ¯্রাধিক কৃষক-কৃষাণী এবং সাধারণ মানুষ মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। কিন্তু কোন প্রতিকার হয় নি। সরকারি নিয়ম রয়েছে কৃষি জমি কৃষক ছাড়া হস্তান্তর করা যাবে না। এবং সরকারের অনুমতি ছাড়া কৃষি জমিতে কোন ধরনের স্থাপনা করা যাবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সবকিছু চলছে ফ্রি-স্টাইলে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সাগরপারের এই জনপদে প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। অভিজ্ঞ মহলের অভিমত ‘কৃষি জমি সুরক্ষা এবং ভূমি ব্যবহার আইনের’ যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরী নইলে সাগরপারের এই জনপদে কৃষি উৎপাদনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান এব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে কৃষি জমি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে মতামত ব্যক্ত করেন। এব্যাপারে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং ল্যান্ড জোনিং কমিটির উপজেলা সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, কৃষি জমি রক্ষায় সরকারের নির্দেশনা অনুসারে কাজ চলছে।