চট্টগ্রাম রাজনীতি

১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন

gboy_1339766703_1-bnp-flag_13857 (1)শাহ মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম, চাঁদপুর:আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নিয়ে চাঁদপুরের রাজনৈতিক অঙ্গণ এখনো তেমন সরগরম হয়ে উঠেনি। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে বড় দুই দলের কিছু কিছু প্রার্থীকে মাঠে দেখা গেলেও মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ভেতর এ বিষয়ে তেমন কোন আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সরকারি দলের নেতারা ব্যস্ত নিজেদের আখের গোছানো ও বিদেশ ভ্রমণে, আর বিরোধীদলের নেতা-কর্মীরা রয়েছে হতাশায়। বড় দু’টি দলেরই নেতা-কর্মীরা নানা উপ দলে বিভক্ত। ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং চাওয়া-পাওয়া নিয়ে এসব দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এমপিদের বেশিরভাগই জনবিচ্ছিন্ন। তারা নির্দিষ্ট একটা বলয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন। কেউ কেউ অতিমাত্রায় আতœবিশ্বাসীও।

চাঁদপুর মূলত বিএনপি সমর্থকবেষ্টিত একটি এলাকা। ৯০’ পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের প্রায় সব নির্বাচনেই বিএনপি প্রার্থীরা আসন বেশি পেয়ে আসছিলেন। গত নির্বাচনের আগে চাঁদপুর জেলায় আসন সংখ্যা ছিল ছয়টি। গত নির্বাচনের আগে আসন পুনর্বিন্যাস করে এর সংখ্যা কমিয়ে পাঁচটিতে নামিয়ে আনা হয়। শুধুমাত্র নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট এ জেলার ৫টি আসনের মধ্যে ৪টিতে জয়লাভ করেছিল। জয়ের এই আতœতুষ্টি আ’লীগকে অতিমাত্রায় আতœবিশ্বাসী করে তোলে। সরকার গঠনের পর তাই দলের এমপিদের অধিকাংশই এলাকার দিকে তেমন একটা নজর না দিলেও নিজেদের আতœীয়-স্বজন, কাছের লোকদের নানা সুবিধে পাইয়ে দেবার ক্ষেত্রে এবং এর মাধ্যমে নিজেরাও লাভবান হওয়ার ব্যাপারে যতেষ্ঠ আন্তরিক ছিলেন। এই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। কিছু কিছু লোকের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। যারা একসময় রিক্সা ভাড়ার অভাবে পায়ে হেঁটে চলাচল করতো তারা এখন দামি দামি গাড়িতে চড়ে, বিদেশী সুগন্ধী ব্যবহার করে, ঘন ঘন বিদেশ যায়। এমপিদের প্রশ্রয়ে এরা জমি দখল, নদী দখল, বালু দখল, ফেরি ঘাট দখল, টেন্ডারবাজি, সরকারি খাস সম্পত্তি দখল, ভিপি সম্পত্তি নামে বেনামে অবমুক্তকরণ, চাঁদাবাজি, প্রশাসন পরিচালনা, কাবিখা, কাবিটার নিয়ন্ত্রণ – সবই করছে। মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এদের প্রভাব, প্রতিপত্তি ও দাপটের কাছে অসহায়। তাই তারা ক্ষুব্দ, বিস্মিত। এর ফল আগামী নির্বাচনে আ’লীগকে বহন করতে হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। অন্যদিকে বিএনপি আভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারাত্বকভাবে জর্জরিত। দলের ভেতর প্রায় সব নেতার নেতৃত্বেই এক একটি করে গ্রুপ রয়েছে। নিজেদের ভেতর এরা শুধু দ্বন্দ্বতেই লিপ্ত নয়, সংঘাতেও জড়িত হয়ে পড়ছে। প্রায়ই বিএনপি’র বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের মঞ্চে পর্যন্ত আগুন দিয়েছে। মামলা-পাল্টা মামলা, বহিস্কার-পাল্টা বহিস্কার, কমিটি-পাল্টা কমিটি তো নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে চাঁদপুরে বিএনপি’র শীর্ষ রাজনীতিকরা টাকা দিয়ে রাজনীতি করতে অভ্যস্থ। অভিযোগ রয়েছে, কোন কোন নেতা মাসোহারার ভিত্তিতে কর্মী পালন করেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়মিত ও মূল্যবান উপঢৌকন দিয়ে পদ-পদবি ঠিক রাখেন।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুরের ৫টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪টিতে ও বিএনপি ১টিতে জয়ী হয়। সে জন্য সরকার দলীয় এমপিরা মনে করছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাদের মনোনয়ন অপরিবর্তিত থাকবে। তবে নানা পর্যবেক্ষণে বুঝা গেছে, ৪টি আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত থাকলেও চাঁদপুর-২ আসনে মনোনয়ন পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে চাঁদপুর-১ ও চাঁদপুর-৪ আসন ছাড়া বাদবাকি তিন আসনেই একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছে।

 

সূত্র জানায়, চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনে আওয়ামী লীগের ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপির দলীয় মনোনয়ন এবারও প্রায় চূড়ান্ত। এ আসনে বিএনপির এবারো প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও এমপি আনম এহসানুল হক মিলন। মিলনের স্থলে বিএনপির ২-১ জন মনোনয়ন প্রত্যাশীর নাম শোনা গেলেও তা তেমন জোরালো নয়। মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-২ আসন। এ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) মোঃ রফিকুল ইসলাম। সামনের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের শক্ত মনোনয়ন প্রত্যাশী হচ্ছেন সাবেক এমপি, প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীর বিক্রম)। এ আসনে বিএনপির গতবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোঃ নূরুল হুদা। তিনি এবারও ধানের শীষের মনোনয়ন পেতে মাঠে রয়েছেন। তার শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছেন গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করা ড. জালাল উদ্দিন। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হয়ে আলোচিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন পেতে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন তিনি।

চাঁদপুর-৩ (চাঁদপুর সদর-হাইমচর) আসনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেত্রী ও সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপির মনোনয়ন এবারো প্রায় চূড়ান্তই বলা যায়। তিনি এ আসনে জনগণের ভোটে এমপি নির্বাচিত হওয়ায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এ আসনটি আওয়ামী লীগ পেলো। ফলে তাঁকে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। ইতিমধ্যে ডাঃ দীপু মনি তাঁর নির্বাচনী মাঠ গোছানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এ আসনে দলের মনোনয়ন চাইবেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা সুজিত রায় নন্দী। গতবার তৃণমূল নেতাদের মতামত তার পক্ষে ছিল। অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ ইউসুফ গাজী মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন বলে তার ঘনিষ্ঠজন সূত্রে জানা যায়। এ আসনে বিএনপির সাবেক এমপি এসএ সুলতান টিটুকে ডিঙ্গিয়ে গতবার দলীয় মনোনয়ন পেয়ে চমক সৃষ্টি করেন সাবেক এমপি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি জিএম ফজলুল হক। তিনি বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চাঁদপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি। এবারও তিনি দলীয় মনোনয়ন নিজের আয়ত্তে নিতে মরিয়া হয়ে লবিং অব্যাহত রেখেছেন। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চূড়ান্ত না হওয়ায় উন্মুক্ত মাঠ পেয়ে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীকে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যায়। এ আসনে বিএনপির জোরালো মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চাঁদপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। জেলা বিএনপির নেতৃত্ব এখন তার হাতে। সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এসএ সুলতান টিটুও চেষ্টা করছেন দলীয় মনোনয়ন নিয়ে মাঠে আসতে। পাশাপাশি মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামালউদ্দিন চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মাহবুবুর রহমান শাহীনের নাম শোনা যাচ্ছে। এদিকে চাঁদপুর সদর আসনে ডাঃ দীপু মনির প্রতিদ্বন্দ্বী হতে মাঠে বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রাশেদা বেগম হীরার পক্ষে নির্বাচনী এলাকায় ডিজিটাল ব্যানার, ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে। তিনিও দলীয় মনোনয়ন চান।

চাঁদপুর-৪ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনের বর্তমান এমপি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর (অবঃ) মোঃ রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। তিনি এবারও মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন বলে এলাকা সূত্রে জানা যায়। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগের ক’জন মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও তাদের জোরালো ভূমিকা চোখে পড়ছে না। এ আসনে বিএনপিতে রয়েছে কোন্দল। গতবার সাবেক এমপি এমএ মতিনকে টপকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করে হেরে যান জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি ইঞ্জিঃ মমিনুল হক। এ দু’জন এবারও দলীয় মনোনয়নের জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। সভা-সমাবেশ তথা গণসংযোগে এগিয়ে রয়েছেন মমিনুল হক।

চাঁদপুর-৫ (ফরিদগঞ্জ) আসনে বিএনপির এমপি লায়ন হারুনুর রশিদ। তিনি বিএনপির নির্বাহী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক। বিএনপির দুঃসময়ে ফরিদগঞ্জ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে দলের কাছে তিনি হিরো বনে যান। এ আসনে গতবার বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়ে তা ধরে রাখতে পারেননি শিল্পপতি এমএ হান্নান। এ আসনে বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী মোঃ মোতাহের হোসেন পাটওয়ারী। যিনি বর্তমান ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। গতবার তাকে দলীয় মনোনয়নের চিঠি দেয়ার জন্য বিএনপির চেয়ারপার্সন কার্যালয়ে নেয়া হয়। কিন্তু তিনিও মনোনয়ন বঞ্চিত হন। এবার ফরিদগঞ্জ আসনে হারুনুর রশিদের প্রতিপক্ষ হয়ে দলের মনোনয়ন পেতে জোরালো লবিং করছেন শিল্পপতি মোতাহের হোসেন পাটওয়ারী ও এমএ হান্নান। তারা এবার রোজায় প্রতি বছরের মত যাকাত নিয়ে নির্বাচনী মাঠে ছিলেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের রয়েছে পুরানো দ্বন্দ্ব। এখানে এবারও গতবারসহ দুইবারের দলীয় মনোনয়ন পাওয়া সাংবাদিক শফিকুর রহমান নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে থাকতে চাচ্ছেন। একটি মহলের দাবি এবারো মনোনয়ন তিনিই পাবেন। এদিকে একই দলের গতবারের মনোনয়ন বঞ্চিত চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়াও দলের মনোনয়ন পেতে দৌড়-ঝাঁপ দিচ্ছেন।

বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সহসাই বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল এবং সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন। তারা নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন না। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের গ্রুপিং ক্রমান্বয়ে চাঙ্গা রূপ নিচ্ছে। তা নেতাদের ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড প্রচারণায় সবাই দেখছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন্ দিকে গড়ায় তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছে সাধারণ জনগণ।

তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আগামী নির্বাচনে চাঁদপুরের পাঁচটি আসনের মধ্যে কে ক’টি পাবে তা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখনো চ’ড়ান্ত কিছু বলা না গেলেও সাধারণ মানুষের সাথে আলাপ করে যা বুঝা গেছে, নির্বচনের হাওয়া বিএনপি’র অনুকূলে।