অপরাধ ঢাকা লাইফ স্টাইল

ঐশী কী সমাজের সতর্কবার্তা

oishii-0120130827225302হটনিউজ২৪বিডি.কম ,ঢাকা, ২৮ আগস্ট :  জানিনা কি করে সম্ভব। সন্তান হয়ে নিজের জন্মদাতা বাবা-মাকে কীভাবে হত্যা করতে পারে। তাও আবার একটি মেয়ে।

এতদিন ঘটনাটি নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও গভীরভাবে ভাবা হয়নি। ঘটনাটা তখনও কেবল সন্দেহের পর্যায়ে ছিল। বাবা-মা খুন হওয়ার পর থেকেই মেয়েটি পালিয়ে রয়েছে। ভেবেছি এটা অবশ্যই অন্য কারো কাজ।
মেয়েটি যখন আত্মসমর্পণ করল পর মুহূর্তেই রহস্যের জট খুলতে লাগল। আমার ভাবনাটাও পরিস্কার হয়ে গেল। অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি পরিস্কার হয়ে গেল।
সত্যি এবার বিস্ময়ে আমি বিমুরহ হয়ে গেলাম। আমার অনুমানটা মিথ্যা হল। মেয়েটি নিজেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। মেয়েটি তাই স্বীকারোক্তি দিল। তার হাতেই খুন হয়েছেন প্রিয় বাবা আর মা।
আমার জানামতে এরকম ঘটনা আর নেই। এমন চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমাদের দেশে একপ্রকার ব্যতিক্রম।
মাহফুজুর রহমান। পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক । তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। দুজনই খুন হলেন তাদেরই পরম আদরে, মমতায় আর স্নেহে বড় হওয়া মেয়ে ঐশির হাতে।
শুধু হত্যা না, বাবা মাকে ক্ষতবিক্ষত করেই খুন করেছে মেয়েটি। অথচ মেয়েটির বয়স মাত্র ১৮ বছর। আর এই ১৮ বছর বয়সেই বাবা-মাকে খুনের মতো এত বড় একটি অপরাধ কিভাবে করতে পারল সে জানিনা।
এখনো পর্যন্ত জানা গেছে, ঐশী ছিল মাদকাসক্ত। এক সময় ঐশীর বাবা মা জানতে পারে তাদের মেয়ের মাদকাসক্তে আসক্তির কথা।
জানা যায় ঐশী নিয়মিত ইয়াবা সেবন করত। তার ইয়াবার যোগান দিত ঐশীর কাছের বন্ধুরা। আর সেই বন্ধু বান্ধব ছিল তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। মাদকাসক্ত হয়ে প্রায়ই ঐশী তার বাবা মার সঙ্গে খারাপ আচরণ করত। কোন রকম নিয়ম কানুনের মধ্যে থাকত না সে। রাত করে বাসায় তো ফিরতই । রাতের বেলায় ছেলে বন্ধুকে নিয়ে বাসায় আসত।
উচ্ছৃঙ্খলতা যখন চরম পর্যায়ে তখন বাবা মা বোঝাতে চেষ্টা করেন মেয়েকে। কিন্তু ইয়াবার নিকষ কালো অন্ধকারে ততদিনে ডুবে গেছে ঐশী। বাবা মা যত বাধা দেয়, ইয়াবার ঝাপসা ধোয়ায় ঐশির কাছে বাবা মা তখন চরম শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে।
ধিরে ধিরে এই শত্রু আরও বড় হয়ে ওঠে। ঐশী কোনভাবেই বাবা মায়ের এই শাসন মেনে নিতে পারছিল না। কিভাবে তাদের শায়েস্তা করা যায় ভেবেছে সে বারবার। একপর্যায়ে ধোঁয়ার নেশায় ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে বসে বাবা-মাকে।
খুব বেশি চিন্তা এবং কষ্ট করতে হয়নি তার। কফির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ পান করিয়ে প্রথমে চেতনানাশ করা হয়। এরপর নির্মমভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন।
কি বলব এটিকে। খুন নাকি কোন সতর্কবার্তা ? সেই সতর্কবার্তা সমাজ এবং বাবা মা। নাকি অন্যরকম কোন প্রতিবাদ?
হয়তো বাবা মাকে খুন করার সময় আক্ষেপ নিয়ে বলছিল, আমাদের নিয়ন্ত্রণ করো। আমরা যেন নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে যেতে না পারি। মাদকের ধোঁয়ায় আমরা যেন তলিয়ে না যাই।
বিষয়টি হেলাফেলা ভাবে নেয়ার মত কোন ঘটনা না। সমাজে এমন পরিবারের অভাব নেই যেসব পরিবারের বাবা-মা জানেনই না যে তার ছেলে- মেয়ে কি করছে। কোথায় যাচ্ছে। তাদের সন্তানদের বন্ধু বান্ধব আসলে কারা। আমাদের এই ঢাকা শহরেই অনেক পরিবার আছে যেখানে বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানদের ঠিকমতো কথাবার্তাই হয় না। একই বাড়িতে থাকলেও প্রত্যেকে যার যার সোসাইটি মেইনটেইন করছে।
অথচ তারা একই ছাদের নিচের মানুষ। সারাদিনে দেখা হলেও কোনরকম দু’একটি কথাবার্তাতেই শেষ। তাতে থাকে না বাবা মা ও সন্তানের সম্পর্কের কোনরকম ইমোশন। কথায় আছে যে আদর করতে জানে সেই শাসন করতে পারে।
যে সন্তান কখনো বাবা মার আদর ভালোবাসা পায়নি সে কেন হঠাৎ করে তাদের শাসন মেনে নেবে? আর সেই সন্তান যদি হয় মাদকাসক্ত তাহলে আর কি কথা থাকে। বাবা মায়ের প্রতি সন্তানের যে আবেগ তা তারা বুঝবেনা। পিতা মাতা তখন পরিণত হয় শত্রুতে।
বাবা-মাকে খুন। ভাবা যায় ! জীবজন্তুকেও আঘাত করতে মানুষের বাধে। তার মানে সামাজিক অবক্ষয় কতটা নিচে নামলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।
সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অভাবে নানা রকম ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটে চলেছে।
যিনি এমন একটি নির্মম ঘটনার স্বীকার সেই পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিনিয়ত সমাজের নানারকম অপরাধ ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন। আর তাকেই খুন হতে হলো । তা-ও আবার ………
এতক্ষণ এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কথা বললেও এই লেখাটা আসলে সব বাবা-মায়েদের উদ্দেশ্যে।
সব অভিভাবকের উচিত সন্তানের সঠিক পরিচর্যা করা। পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের ভিত্তি তৈরি করা । চারা রোপণের পর যেমন লক্ষ রাখতে হয় ঠিকমত পানি দেওয়া হচ্ছে কিনা। আবার পানির আধিক্যের কারণে চারা যাতে নষ্ট হয়ে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়।
নজর রাখা উচিত ছোট থেকেই। সন্তান কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে সব খেয়াল রাখা দরকার। সারা বছর খবর না রেখে হুটহাট বাবার দায়িত্ব আর মাতৃ-গিরি ফলাতে আসলে তো সমস্যা হবেই। বাবা মা আর সন্তানের সম্পর্ক তো আসলে আদর, মমতা, স্নেহ আর ভালবাসার। তাই ওদের ভালবাসুন, আদর করুন। ওদের সাথে কথা বলুন। মন খুলে। তাদের মনের ভেতরে ঢুকে জানতে চেষ্টা করুন। কি চায় ওদের নরম মন।
এই কাজগুলি, স্রেফ এই কাজগুলি যথাযথ ভাবে করুন। দেখবেন সন্তান বিপদগামী হবে না। মাদকাসক্ত হবেনা। ভালোবাসা আর শাসনের সংমিশ্রণে কোন সন্তান অকালে ঝরে যেতে পারেনা।
সন্তান যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে কি হবে এত অর্থ বিত্ত দিয়ে? টাকা দিয়ে সব পাওয়া যায়না। লালন বলে গিয়েছেন “ সময় গেলে সাধন হবেনা”। তাই সময়ের কাজ সময়ে শেষ করুন।
আগেই সতর্ক হন। অর্থ বিত্তের পেছনে ছুটতে নেই মানা। তার চেয়ে বড় সম্পদ সন্তানদেরও পর্যাপ্ত সময় দিন। ভালো সম্পর্ক রাখুন। জীবন চালাতে টাকার সত্যিই বিকল্প নেই। কিন্তু কোনভাবেই যেন ছেলেমেয়ের জীবন ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেন।
জীবনে এতকিছু করছেন। সবই সন্তানদের জন্য। আর যাদের জন্য করছেন, সেই সন্তানরাই যদি ঠিক না থাকে তাহলে লাভ কি?
সন্তান মূল্যবোধের শিক্ষাটা পায় বাবা মায়ের কাছ থেকেই। তাই এটা ভেবেই ক্ষান্ত হবার কিছু নেই যে সন্তান তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় গড়ে উঠছেই। তাহলে আর চিন্তা কি?
শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পর্বই সব নয়। সামাজিক শিক্ষাটা বেশি দরকার। আর সব ধরনের শিক্ষার শুরুই হয় পরিবার থেকে। সন্তানের এই পারিবারিক শিক্ষার ব্যত্তয় ঘটলে তার ঝরে পড়া সময়ের ব্যাপার।
এমন এক সময় ছিল যখন পারিবারিক শিক্ষার কোন অভাব ছিলনা। ছিলনা মাদকের কুণ্ডলী পাকানো ভয়াল গ্রাস।
পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি ঐশী এখন ভালো হতে চায়। তার এই চাওয়া আরও আগেই পুরন হতে পারত।
যাই হোক, যুদ্ধ এখন আমাদেরই করতে হবে। সব অভিভাবককে হতে হবে সতর্ক আর দায়িত্বশীল। আর পরিবর্তন করতে হবে সমাজ ব্যবস্থার।
দেশে ঘটে যাওয়া এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর এখন এই প্রশ্ন সবার – আসলে দোষী কে?