অপরাধ চট্টগ্রাম

হত্যা করলো চাঁদপুরের কলেজ ছাত্র মাঈনুদ্দীনকে

Chandpur,01শাহ মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম, চাঁদপুর:বন্ধুর ফোন এসেছে তাই একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে। এ বলেই মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ১০দিন পর লাশ হয়ে বাড়ি ফিরল কলেজ ছাত্র মাঈনুদ্দীন চিশতি শামীম (১৯)। বাড়ি থেকে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তার বাবার ফোনে কল আসে মুক্তিপণের টাকার জন্যে। এ টাকা নিয়ে দীর্ঘ ৯ দিন বাবা মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম তালুকদার হত্যাকারীদের কথা অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে ঘুরেও ছেলেকে বাঁচাতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত হাজীগঞ্জ ও রামগঞ্জ এলাকার সীমান্তবর্তী স্থানে নির্মমভাবে হত্যার শিকার ওই কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার করে রামগঞ্জ থানা পুলিশ। গত শনিবার লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর থেকে নিহত কলেজ ছাত্রের বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলা ৫নং রামপুর ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া তালুকদার বাড়িতে রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ হয়ে যায়। রোববার সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে কলেজ ছাত্রের লাশ এসে বাড়িতে পৌঁছলে এলাকার হাজার হাজার লোক এক নজর দেখতে ওই বাড়িতে ছুটে আসে। এ সময় পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। আর এ ঘটনায় ইতিমধ্যে থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।

সরজমিন পাঁচবাড়িয়া তালুকদার বাড়িতে গেলে দেখা যায়, ওই বাড়িতে দিনভর হাজার হাজার লোক যাওয়া-আসা করছে। কথা হয় নিহত কলেজ ছাত্রের বাবা মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম তালুকদারের সাথে। কোনোভাবেই তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। বাড়ির উঠানে একটি চেয়ারে বসে কান্না জড়িত কণ্ঠে বিভিন্নজনের সাথে মুঠোফোনে কথা বলছিলেন। ঘরের ভেতরে ৫ বোনের ভাই হারানো ও মায়ের সন্তান হারানো গগন বিদারী কান্না বাড়িতে আসা শত শত নারী-পুরুষের চোখও ভিজিয়ে দিচ্ছে। সবার একই জিজ্ঞাসা কেন এ হত্যা? যে কিনা মাত্র এইচএসসি পাস করলো, তার সাথে কার এমন শত্রুতাা? শুধুই কী টাকার জন্য এ হত্যা? নিহত শামীমের বাবা মুক্তিপণের ১৫ লাখ টাকা নিয়ে হত্যাকারীদের সাথে যোগাযোগও করেছিলেন।

মাঈনুদ্দীন চিশতি শামীম স্থানীয় ছোটসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে হাজীগঞ্জ মডেল কলেজে ভর্তি হয়। গত বছর অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় শামীম এক বন্ধুকে সহযোগিতা করতে গিয়ে পরীক্ষায় বহিস্কার হয়। কিন্তু কলেজ সূত্রে জানা গেছে, শামীম অত্যন্ত মেধাবী ও ভালো ছাত্র হিসেবে কলেজে তার সুনাম ছিল।

তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম তালুকদার সাবেক ইউপি সদস্য। তিনি জানান, পরিবারের ৭ সদস্যের মধ্যে ৬ষ্ঠ সন্তান হচ্ছে নিহত মাঈনুদ্দীন চিশতী শামিম। গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যার কিছু পরে তার স্ত্রী বাড়িতে একা ছিলেন। এ সময় শামীমও বাড়িতে ছিল। তার মা অসুস্থ। সন্ধ্যার কিছু পরে শামীমের ফোনে একটি কল আসে। কলটি পেয়ে সে প্যান্ট-শার্ট পরে প্রস্তুত হয় বের হওয়ার জন্য। এ সময় তার মা জিজ্ঞাসা করেন তুমি কোথায় যাচ্ছ। উত্তরে শামীম মাকে বলে এক বন্ধু ফোন করেছে আমি কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসছি। এ যাওয়াই শামীমের শেষ যাওয়া। রাত ১১টার দিকে বাড়িতে ফিরে তার মাকে ছেলে ফিরেছে কিনা জিজ্ঞেস করি। তখন শামীমের কাছে আসা ফোন কল ও কিছুক্ষণের মধ্যে ফেরার কথা তার মা জানায়। তাৎক্ষণিক শামীমের ফোনে ফোন দেই। এ সময় অন্য এক ব্যক্তি শামীমের মুঠোফোন রিসিভ করে বলে আপনার ছেলে আমার কাছে আছে। তাকে নিতে হলে আমাদেরকে টাকা দিতে হবে। তখন তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা এশিয়ান গ্রুপের লোক বলে পরিচয় দেয়। তখন তাদেরকে অনুরোধ করি আমার ছেলের ক্ষতি যেনো না করা হয়, আমি তাদের দাবিকৃত টাকা পৌঁছে দেবো।

এর পরের দিন কাউকে কিছু না জানিয়ে আমি হাজীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করি। ঘটনার ৩ দিন পর আমাকে মোবাইল ফোনে ই-মেইল অ্যাড্রেস দিয়ে অপহরণকারীরা বলে আমার একটি ছবি ও ১৫ লাখ টাকার ছবি তুলে তাদের দেয়া ই-মেইল অ্যাড্রেসে পাঠাতে। সে নিয়ম-কানুন জানি না বিধায় তাদেরকে জানিয়ে দিলে তারা বলে টাকা নিয়ে নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ উপজেলার থানার পাশে যেতে। সে মতে টাকা নিয়ে আমি একটি সিএনজি স্কুটারযোগে রামগঞ্জ থানার পাশে গিয়ে তাদের মুঠোফোনে ফোন দিলে তারা ফের জানায় ওখানে নয়, হাজীগঞ্জ সীমান্তবর্তী গ্রাম রামগঞ্জ এলাকার নোয়াগাঁও যাওয়ার জন্যে। সেখানে গিয়ে পুনরায় ফোন দিলে ফের আবার পার্শ্ববর্তী এলাকা পানিওয়ালা যাওয়ার জন্যে বলে। এখান থেকে একই কায়দায় দিকদাইর এলাকায় যাওয়ার জন্যে বলে। এর ফাঁকে ওই চক্রটি মুঠোফোনে জানায় টাকা পৌঁছে দিলে এখন আপনার ছেলের চশমা, মোবাইল ফোন ও ঘড়ি ফেরৎ দেয়া হবে। তখন আমি বুঝতে পারি আমার ছেলে বেঁচে নেই। এর পরেই আমি ওখান থেকে সরে আসি। আর ১০ দিন পর গত শনিবার খবর পেয়ে আমার ছেলের লাশ সনাক্ত করি। ছেলেকে মেরে ফেলা হবে এ ভয়ে তিনি বিষয়টি থানা পুলিশকে জানাননি।

এ দিকে তালুকদার বাড়িতে যখন শোকের মাতম চলছে তখনও হত্যার সাথে জড়িত ওই চক্রটি শামীমের বাবার মুঠোফোনে বারবার হুমকি দিচ্ছিল টাকা দেয়ার জন্যে, নচেৎ তার বাকি ছেলেকেও মেরে ফেলা হবে।