জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর শিক্ষাঙ্গন

৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের অপেক্ষায়

UGC20130826234635নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা, ২৭ আগস্ট : সরকার আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দিতে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির জন্য ২১ আগস্ট ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ওই তালিকা থেকে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটির ব্যাপারে সম্মতি দেন।
সূত্র জানায়, এরপর সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনুমতিক্রমে পাঁচটির সঙ্গে আরও তিনটি যুক্ত হয়। দু-একদিনের মধ্যে ওই তালিকা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
শিক্ষাসচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রক্রিয়া চলছে। তবে কয়টি অনুমোদন করা হবে তা এখন পর্যন্ত ঠিক হয়নি। এদিকে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও সনদ বাণিজ্যের ব্যাপারে ভুরি ভুরি অভিযোগ এবং অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগামহীন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও এগুলোর লাগাম টানতে না পারা সত্ত্বেও একের পর এক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা উষ্মা প্রকাশ করেছেন।
তারা বলেছেন, নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের চেয়ে শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণ জরুরি। কিন্তু সে দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।
বর্তমান সরকারের আমলে এখন পর্যন্ত চার দফায় নতুন ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। প্রথম দফায় গত ১৩ মার্চ আটটি অনুমোদন পায়। ১৬ অক্টোবর অনুমোদন পায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
এটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে সব ধরনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া লংঘনের ঘোরতর অভিযোগ রয়েছে। ১৮ নভেম্বর অনুমোদন পায় আরও সাতটি। এরপর মিশনারি পরিচালিত নটর ডেম কলেজের আদলে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পায়।
সবশেষে গত মে মাসে অনুমোদন দেয়া হয় টাইমস ইউনিভার্সিটিকে। এসব নিয়ে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১। আরও সাতটির অনুমোদন দিলে এ সরকারের আমলেই অনুমোদন দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াবে ২৫।

এর আগে অবশ্য সর্বাধিক সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের রেকর্ড স্থাপন করে গেছে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকার। তাদের ৫ বছরে ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। সেখানে আওয়ামী লীগের বিগত আমলে পাঁচ বছরে মাত্র ছয়টি ইউনিভার্সিটি অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয় সরকারের বিগত আমল দুটি দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদনের ঘটনা কম।
কিন্তু এ সরকারের আমলে দলীয় পরিচয়েই প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের হল, শিক্ষামন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির পেছনে খোদ শিক্ষামন্ত্রীই রয়েছেন।
সূত্র জানায়, নতুন যে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় সহসাই অনুমোদন পেতে পারে সেগুলি হচ্ছে- প্রধানমন্ত্রীর নিকটাআত্মীয়ের ফারইস্ট ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ভিসির নর্থবেঙ্গল ইউনিভার্সিটি, কুমুদিনী ট্রাস্টের রনদাপ্রসাদ ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজারের এক আওয়ামী লীগ নেতার কক্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আওয়ামী লীগের আরেক নেতার টাঙ্গাইলে জার্মান ইউনিভার্সিটি, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার এক বন্ধুর রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংসদের একজন হুইপের শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ইউনিভার্সিটি।
ইতিপূর্বে অনুমোদিত : প্রথম দফায় গত ১৩ মার্চ সরকার যে ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয় সেগুলো হচ্ছে- রাজধানীতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, নারায়ণগঞ্জে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হামদর্দের হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় অব বাংলাদেশ, কিশোরগঞ্জে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. দুর্গাদাস ভট্টাচার্যের ঈসা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’, রাজশাহীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক সাইদুর রহমানের ছেলে হাফিজুর রহমান খানের বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের গোলাপগঞ্জে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ইকবাল আহমেদ খানের নর্থইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ, শরীয়তপুরে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীমের নেপথ্য ভূমিকায় জেডএইচ শিকদার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, চুয়াডাঙ্গায় সাংসদ সোলায়মান হক জোয়ারদার সেলুনের ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি, চুয়াডাঙ্গা।
১৮ নভেম্বর অনুমোদন পাওয়া ৭টি হচ্ছে- সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সুপারিশে অনুমোদন পাওয়া সিরাজগঞ্জে খাজা ইউনূস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু ও শিক্ষাবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেননের সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি, চিকিৎসক একে আজাদ খানের ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস, ঢাকার বাইরে ফেনী ইউনিভার্সিটি। এটি ফেনীর ট্র্যাংকরোডের বারাহিপুরে অবস্থিত। এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আবদুস সাত্তার নামে এক ব্যক্তি।
তবে এর পেছনে আছেন বিগত মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন সহকারী একান্ত সচিব এবং সাবেক একজন রাষ্ট্রদূত। খুলনায় নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি। এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন খুলনার মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেক। তবে এর মূল উদ্যোক্তা খুলনায় দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধ শাখা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামে পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান হলেন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম। এর চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন জহির আহম্মেদ। কুমিল্লা বিশ্বরোডের পদুয়ার বাজারে ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান হলেন এএম মাজাহারুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১২৪টি প্রকল্প প্রস্তাবনা (পিপি) জমা পড়েছে। এর অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) দিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করিয়ে এর উপযোগিতাসহ অন্তত সাতটি বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। ওই পরিদর্শন নিয়ে অবশ্য ইউজিসির একশ্রেণীর কর্মকর্তার ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।
উল্লেখ্য, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য ইউজিসি যে সাতটি পূর্বশর্তের (বিষয়ের) ওপর তদন্ত এবং নম্বর প্রদান করে সেগুলি হচ্ছ- বোর্ড অব ট্রাস্টিজে কে বা কারা, ২৫ হাজার বর্গফুটের ভবন আছে কিনা, ভৌত অবকাঠামো সুবিধা, ভাড়া করা ভবন ব্যবহারে মালিকের অনুমতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ (গার্মেন্ট বা মার্কেট কিনা), স্থায়ী ক্যাম্পাস ও জমি, অবৈধ আউটার ক্যাম্পাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা ইত্যাদি।