জাতীয় ঢাকা

আওয়ামী সিন্ডিকেটের কবলে রাজধানীর কোরবানির পশু হাট

korbani-bg220130825201149স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,হটনিউজ২৪বিডি.কম,ঢাকা: আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ সিন্ডিকেটের কবলে রাজধানীর অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটের ইজারা। এ সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এবার পশু হাটের নিলামে কাঙিক্ষত দাম পাচ্ছে না সিটি কর্পোরেশন। সরকারের সহযোগী এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা পশু হাটের ইজারা পেতে মরিয়া। প্রতিদিনই নগর ভবনে এসে হাট ইজারায় প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে তারা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, শাসকদলীয় এই সিন্ডিকেট চক্র এতটাই প্রভাবশালী যে এবার পশুর হাটের জন্য তাদের বাইরে অন্য কেউ প্রায় সিডিউলই কিনতে পারেনি। আবার যারা সিডিউল ক্রয় করেছেন তাদেরও সেই সিডিউল জমা দিতে বাধার সৃষ্টি করেছে এই চক্র। এর প্রমাণ মেলে সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ থেকে।

সম্পত্তি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে শুধু নগর ভবন থেকেই পশুর হাটের ইজারা বরাদ্দ ফরম বিক্রি হয় ৮৭টি। এর বাইরে আঞ্চলিক কর্মকর্তার অফিস থেকে বিক্রি হয়েছে ১২টি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মোট ইজারা ফরম বিক্রি হয় ৯৯টি। কিন্তু প্রথম দিন দরপত্র খোলার সময় বলা হয় মোট ৪১টি ফরম জমা পরেছে। এরমধ্যে আঞ্চলিক অফিসের ১২টি ফরমের মধ্যে জমা পড়ে মাত্র ৭টি। আর নগর ভবনের ৮৭টির মধ্যে জমা পড়ে মাত্র ৩৪টি। হিসাবমতে দেখা যায় বিক্রিত ইজারা ফরমের অর্ধেকও জমা পরেনি।

খোঁজ নিয়ে এর মূল কারণ হিসেবে জানা গেছে, শাসকদলীয় সিন্ডিকেটের কারণে অনেকে ভয়েই ইজারা ফরম জমা দিতে আসেননি। আবার অনেক নেতা একাধিক নামে ফরম ক্রয় করে কাঙ্ক্ষিত পশুর হাট নিজের অধীনে রাখার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে খিলগাঁও মেরাদিয়া হাটের দখল নিতে শাহ আলম ও হাজী শাহ আলমের নামে ফরম ক্রয় করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। দু’টি ফরমেরই দাম প্রায় কাছাকাছি। একটি ফরমের মূল্য দেখানো হয়েছে ৩ লাখ, অন্যটির ৪ লাখ টাকা।

অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সবচাইতে বড় হাট আরমানিটোলা নিজের অধীনে ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পুরান ঢাকার ৬৯ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ইলিয়াস রশিদ। তার চাপের কারণে অন্যরা ফরম জমা দিতে পারেননি। ফলে ডিএসসিসি এবার বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে এই হাট থেকে।
প্রতি বছরই সবচাইতে বেশি দামে ইজারা দেওয়া হয় আরমানিটোল পশুর হাটকে। গত বছরও এ হাটের ইজারা বাবদ আদায় হয় ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এবার সেই হাটের প্রথম পর্যায়ে ইজারা মূল্য উঠেছে মাত্র ২ কোটি ১১ লাখ ৫০১ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের অর্ধেক মূল্যও ওঠেনি এবার। যদিও ডিএসসিসি’র পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত দর না পেলে আরও তিন দফা টেন্ডার হবে এসব হাটের।

এ বছর কোন পশুর হাটের ইজারা মূল্যই খুব বেশি বাড়েনি। এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১০টি অস্থায়ী পশু হাটের মধ্যে হাজারীবাগের ঝিগাতলা মাঠের গতবছর দরপত্র মূল্য ছিলো ২০ লাখ ৫ হাজার টাকা। এবার প্রথম দফায় তা বাড়িয়ে হয়েছে ৫৫ লাখ ৩৪ হাজার ২০ টাকা। লালবাগ রহমতগঞ্জ খেলার মাঠের গতবছর টেন্ডার মূল্য ছিলো ৬ লাখ ১ হাজার ৬০৮ টাকা, এবার হয়েছে ৬ লাখ ৩১ হাজার ৬৮৯ টাকা। খিলাগাঁও মেরাদিয়া মাঠের ইজারা গত বছর ছিলো ৩৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, এবার হয়েছে ১০ লাখ ৫ হাজার টাকা। সাদেক হোসেন খোকা মাঠ গত বছর ছিলো ২৬ লাখ টাকা, এবার হয়েছে ২৬ লাখ ৫১ হাজার টাকা। গোলাপবাগ মাঠের পাশে সিটি করপোরেশনের আদর্শ স্কুল মাঠ ও আশ পাশের ডিএসসিসির খালি জায়গা গত বছর ছিলো ৩২ লাখ টাকা, এবার হয়েছে ৬১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। আরমানিটোলা খেলার মাঠ গত বছর ছিলো ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
এবার তা কমে হয়েছে ২ কোটি ১১ লাখ ৫০১ টাকা। উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজার সংলগ্ন মৈত্রীমাঠ গত বছর ছিলো ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা, এবার হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ধূপখোলা ইস্ট এন্ড ক্লাব মাঠ গত বছর ছিলো ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা, এবার হয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা টাকা। কমলাপুর গোপীবাগ ব্রাদার্স ইউনিয়ন সংলগ্ন বালুর মাঠ গত বছর ছিলো ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবার হয়েছে ২৫ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ টাকা। পোস্তগোলা শ্মশানঘাট মাঠ গত বছর ছিলো ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা, এবার কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকায়।

এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খালেদ আহমেদ হটনিউজকে বলেন, প্রথম দফায় হাটের ইজারা মূল্য কম ওঠায় সিন্ডিকেটের অভিযোগ আসছে। আর এজন্যই আমরা চার দফায় হাটের ইজারা টেন্ডার করার সুযোগ রেখেছি। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা সন্তোষ প্রকাশ করবো ততক্ষণ হাটের পুন:টেন্ডার হবে। এবার সবগুলোর হাটের মূল্যই গত বছরের তুলনায় খুব বেশি একটা বাড়েনি তাই আমরা বেশিরভাগ হাটের পুন:টেন্ডার আহ্বান করবো।

তিনি বলেন, সোম, মঙ্গলবারের মধ্যে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির বৈঠক বসবে। ওই বৈঠকেই পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। সবগুলো হাটের পুন:টেন্ডার হবে না, নাকি যেগুলোর দাম কমেছে সেগুলোর হবে, তা জানা যাবে ওই বৈঠকের পরেই। তবে বৈঠকে যাই হোক যে সমস্ত হাটের মূল্য কমেছে সেগুলো পুন:টেন্ডার হবে এটা নিশ্চিত।

আসন্ন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে গত ২২ আগস্ট প্রথম দফা জমাকৃত দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। এরপর পুন:দরপত্র ফরম ক্রয়ের তারিখ হচ্ছে প্রথম দফায় ১১ সেপ্টেম্বর, দরপত্র দাখিলের সময় ১২ সেপ্টেম্বর।ওই দিন বিকেল ২ টা ৩০ মিনিটে দরপত্র খোলা হবে। এরপর দ্বিতীয় দফায় দরপত্র ফরম বিক্রি হবে ২৬ সেপ্টেম্বর, জমা হবে ২৭ সেপ্টেম্বর, খোলা হবে একই দিন বিকেল ২ টা ৩০ মিনিটে। সর্বশেষ দরপত্র ফরম বিক্রি হবে ১৫ সেপ্টেম্বর, জমা ১৬ সেপ্টেম্বর, খোলা হবে ওই দিন বিকেল ২ টা ৩০ মিনিটে। এরপরই চূড়ান্তভাবে পশুর হাটগুলোর ইজারা ঘোষণা দেওয়া হবে।