খুলনা জাতীয়

সুন্দরবনের বকগ্রাম

ratargul swamp3হটনিউজ২৪বিডি.কম,সুন্দরবন থেকে: সামনের এই আঙিনাডা জন্মের পর থেইকে খালিই দেখতিছি। ২০০৩ সালে কিছু কেওড়ার বিচি ছিটায়ে এরাম বন হইয়ে গেলো। আর আইলার পর থেইকে এখন পর্যন্ত তো এই গ্রামরে সবাই বকগ্রাম বইলে ডাকে। কারণ আমাগের বনডারে বক নিজেগো বাড়ি বানাই নিসে!

সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ১১ নম্বর পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালি গ্রাম। এই গ্রামের বাসিন্দা তরিকুল বলছিলেন কথাগুলো।

তিনি জানান, নিজেদের বাড়ির পাশের আঙিনায় আপনা থেকেই বেড়ে ওঠা প্রায় এক হাজার গাছের ছোট্ট একটি ম্যানগ্রোভ আজ হাজার হাজার বকের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। ঢালি বক, কুঁজবক, গো-বকের কলকাকলিতে প্রতিদিন ঘুম ভাঙে পাতাখালি গ্রামের মানুষের।

মানুষ যে সত্যিই জীববৈচিত্র্যকে মনে ধারণ করে প্রকৃতির মাঝে বেঁচে থাকতে পারে, তরিকুলের পরিবার তাই প্রমাণ করলেন। তার মামা সামাজিক বন বিভাগের সভাপতি আব্দুল হাকিম মোল্লা জানান, তার গ্রামে প্রায় এক হাজার পরিবার বাস করে। কিন্তু কেউ কখনই এসব বকের ক্ষতি হতে পারে, এমন কোনো কাজ করে না।

তবে আজকাল বেশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে অবাধ স্বাধীন এই বক সাম্রাজ্য। প্রায় রাতেই দুর্বৃত্তরা বক ধরে নিয়ে যায় অথবা গাছে উঠে বকের বাসা থেকে ডিম চুরি করে। তবে কে বা কারা এটা করছে, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো কিছু বলতে পারলেন না হাকিম। বন বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে কখনই কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে আজ এই বকগুলো সংরক্ষণ করতে হাকিম পরিবারকেই দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে। রাতে প্রায়ই জেগে থেকে টর্চ জ্বালিয়ে পাহারা দেন হাকিম-তরিকুলরা। নিজ তাগিদেই এই দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন তারা।

পরিবারের অন্য এক সদস্য শাহীদা খাতুন বলেন, এ ধরনের প্রাকৃতিক বনায়নকে কোনোভাবেই হুমকির মুখে ফেলা যাবে না। ২০০৯ সালে আইলার পর যখন সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গায় গাছ কমে যায়, তখন পাতাখালি গ্রামে নির্ভীক দাঁড়িয়ে থাকা ছোট এই বনকে নিজেদের নিরাপদ নিবাস মেনে আস্তে আস্তে এখানে আসতে শুরু করে। কোনো বড় ধরনের আঘাত আসেনি বলেই আজও তারা নির্ভয়ে বাস করছে। আর এই গ্রামকে সবাই বকগ্রাম হিসেবে জানে।

ম্যানগ্রোভের অনেক গহীনে মানুষ বসবাস শুরু করলেও তারা এই বনের প্রাকৃতিক সম্পদ সঠিকভাবে সংরক্ষণের ব্যাপারে তেমন সচেতন নন। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাতাখালি গ্রামে যে কোনোভাবেই হোক, এই বকগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বলে জোর দাবি জানালেন হাজার বকের দায়িত্ব নেওয়া পরিবারটি। তা না হলে, দুর্বৃত্তরা বনের বিভিন্ন জায়গায় যা করে আসছে, তাই করবে এ গ্রামেও।

গাছ কেটে, বা জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে বক ধরে অসচেতনভাবেই জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আবাসস্থল নষ্ট করে ফেলছে তারা। এখানে যেন সে ধরনের কিছু না হয়। বরং জীববৈচিত্র্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসা জন্মানোর ব্যাপারে কাজ করে যেতে চান পাতাখাখি গ্রামের হাজার হাজার বকের অভিভাবক এ পরিবারটি। এই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করলে পরবর্তীতে পাতাখালি গ্রামটি একদিন পর্যটন কেন্দ্রেও পরিণত হতে পারে বলে বিশ্বাস করেন গ্রামবাসী।