খুলনা খেলা

খুলনা জেলা স্টেডিয়াম একজন দুলাল শেখ

KHulna-S20130818124701খুলনা প্রতিনিধি, ১৮ আগস্ট:  খুলনা জেলা স্টেডিয়াম আর দুলাল শেখ এ যেন একই সূত্রে গাথা। স্টেডিয়ামের জন্মলগ্নের পরই জীবনের তাগিদে আর খেলাকে ভালোবাসে এখানে এসেছিলেন দুলাল শেখ। সে আজকের কথা নয়। ১৯৭৬ সালের কথা। তারপর এক এক করে পার করলেন ৩৭টি বছর।

সময়ের সাথে সাথে জীবনের টানে বয়স এখন ভাটির দিকে দুলাল শেখের। দুলাল শেখের সাথে স্টেডিয়ামও যেন বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে পড়েছে।
দুলাল শেখের বয়স নিয়তিবাদী কিন্তু স্টেডিয়াম?
দুলাল শেখ আক্ষেপ করে জানান, বার বার আশ্বাসের পরেও সংস্কার হয় না খুলনা জেলা স্টেডিয়াম।
ঠিক যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। কারণ দীর্ঘ এ জীবনে স্টেডিয়াম পাড়ায় থেকে নিজের খুব বড় সংস্কার করতে পারেননি তিনি।
নিজের চোখে দেখেছেন স্টেডিয়ামের একটু একটু করে গড়ে ওঠা দুলাল শেখ। দেখেছেন একটু একটু করে স্টেডিয়ামের ভেঙে পড়াও। নিজের পুরনো যৌবন আর ফিরে পাবেন না জানেন তিনি। কিন্তু আশায় বুক বাধেন একদিন নিশ্চয়ই এ স্টেডিয়াম তার হারানো যৌবন ফিরে পাবে।
স্টেডিয়াম আর সংশ্লিষ্ট মানুষের মায়ায় এমনভাবে জড়িয়েছেন তিনি। পরিত্যক্ত স্টেডিয়ামের নিচে ঝুঁকি নিয়ে বাস করলেও সেকথা বেমালুম ভুলে গেছেন তিনি। তবে মায়ার বাঁধন এবার ছাড়তে চান দুলাল শেখ।
আসছে কোরবানীর ঈদের পরেই স্টেডিয়ামের চাকরি ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা তার। মুখে খুব সহজে বললেও স্টেডিয়াম ছেড়ে যাওয়াটা যে সহজ হবে না তার ছল ছল চোখই তার প্রমাণ দিচ্ছিল।
তবে দেরিতে হলেও সুখবরও পেয়েছেন তিনি। খুলনা জেলা স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য ১১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। তাই স্টেডিয়াম ছাড়ার সময় খুশী মনেই বিদায় বলতে পারবেন এটাই এখন তার শান্তনা।
এক পাশে কাঠের গ্যালারি দিয়ে ১৯৫৮ সালে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। দুলাল শেখের স্টেডিয়ামে আগমন ১৯৭৬ সালে একজন মাঠকর্মী হিসাবে। তখন স্টেডিয়ামের ভরা যৌবন। পরিবারসহ দুলাল শেখের জায়গা হয় স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের গ্যালারির নিচে। এখন পর্যন্ত সেখানেই আছেন তিনি। এ সময়ে এই মাঠেই তার চোখের সামনে বেড়ে উঠেছেন সালাম মুর্শেদী, আসলাম, রুমি, জোসীরা।
স্মৃতি হাতরে দুলাল শেখ বললেন, “বাংলাদেশের আরও অনেক বড় বড় ফুটবলার খেলে গেছেন এ মাঠে। এক সময়ে এ মাঠে ভরা দর্শক থাকলেও এখন নিয়মিত খেলাই হয় না। আর খেলা হলেও দর্শক আসে না মাঠে।”
তিনি বড় বোদ্ধা নন, তবু তার মূল্যায়নটাকে দামীই মনে হলো। ক্রীড়া সংগঠকরাই মূলত এ অবস্থার জন্য দায়ী। এখন আগের মতো মাঠে সময়ও দেন না, ভালোবাসেন না খেলাটাকে। তারা ঠিকভাবে চাইলেই এ মাঠে আবারও প্রাণ ফেরানো সম্ভব।
তিনি ফুটবল মাঠ তৈরির কাজ যেমন করেছেন, করেছেন ক্রিকেটের উইকেট তৈরির কাজও। পাকিস্তানের জলিল নামে তখনকার একজন পিচ কিউরেটরের কাছে উইকেট তৈরি শিখেছেন তিনি। এরপর থেকেই জেলা স্টেডিয়ামের উইকেট তৈরির কাজ একা করে যান তিনি। শিখিয়েছেন অনেককে। তারই হাতে কাজ শেখা এখন অনেকেই খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়ামের গ্রাউন্ডসম্যান হিসাবে কাজ করেন।
স্বপ্ন দেখেন একদিন জেলা স্টেডিয়াম সংস্কার হয়ে পুনরায় তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে।
সংস্কার প্রকল্প অনুমোদনের ব্যাপারে তিনি জানান, অনেকবারই এরকম শুনেছি। এবার একটু জোড় দিয়েই শুনছি। শেষ পর্যন্ত কাজ শুরু হলেই হয়।
২০১০ সালে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে স্টেডিয়াম পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরই মধ্যে গ্যালারি ধসে একজনের মৃত্যুও হয়েছে। সর্বশেষ ২০১১ সালের মার্চ মাসে পশ্চিম পাশের গ্যালারির রেলিংয়ের এক অংশ ধসে পড়ে। পশ্চিম পাশের গ্যালারির মাঝের বড় অংশ গর্ত হয়ে নিচে পড়ে গেছে। তারই পাশে বসবাস দুলাল শেখের। দিনের বেলায় উঁকি দিয়ে সূর্যের আলো নিচে নেমে আসে। সে আলোতেই হয়তো স্বপ্ন দেখছেন তিনি। আবার স্টেডিয়াম ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন।
দীর্ঘ এ জীবনে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব মিলাতে চান না তিনি। তবুও জানান, মানুষের ভালোবাসাই তার বড় প্রাপ্তি। সারা খুলনা শহরের আনাচে-কানচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বহু ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ। এক সময় যারা এ মাঠে খেলেছেন, ক্রীড়া সংগঠক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন, দর্শক হিসাবে মাঠে এসেছেন, তাদের সবার কাছে দুলাল শেখ প্রিয় এক মুখ। এখনও রাস্তায় দেখা হলে কেউ দুলাল, কেউ দুলাল ভাই, কিংবা দুলাল কাকা বলে সালাম দেয়, এটিই তার জীবনের বড় প্রাপ্তি।
তবে অপ্রাপ্তিও কম নেই। দীর্ঘ ৩৭ বছরের কর্মজীবন শেষ করতে যাচ্ছেন ৫ হাজার টাকা বেতনে। স্টেডিয়াম সংস্কারের আশ্বাসের মতো গত ১০ বছরে বারবার আশ্বাস পেয়েছেন বেতন বৃদ্ধির। কিন্তু বেতন বাড়েনি। এখন আর নিজের জন্য ভাবেন না। স্টেডিয়ামে যারা তার যারা সহকর্মী আছেন তাদের জন্য এ আশ্বাসের বাস্তবায়নই দেখে বিদায় দিতে চান স্টেডিয়ামকে।