জাতীয় ঢাকা রাজনীতি

জামায়াত নিষিদ্ধে ‍আপিল বিভাগে রাষ্ট্র

untitled-BG20130812101538সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ,হটনিউজ২৪বিডি.কম,ঢাকা:মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরু্দ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর দেওয়া ৯০ বছরের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে সোমবার আপিল করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের আলোকে জামায়াতকে নিষিদ্ধেরও আবেদন জানিয়েছেন।

জামায়াতকে নিষিদ্ধের আবেদনটি মূলত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়গুলোর আলোকে বলেই হটনিউজকে জানান অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের প্রধান সমন্বয়ক এম কে রহমান।

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল তার দেওয়া বিভিন্ন রায়ে জামায়াতকে ‘ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন’ (অপরাধী সংগঠন) হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এরা দলবদ্ধভাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। এ দলটি ১৯৪৭ সালে যেমন পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে, তেমনিভাবে বাংলাদেশ সৃষ্টির সংগ্রামেরও বিরোধিতা করেছে।

এমনকি সরকারি-বেসরকারি কোনো পদে যেন স্বাধীনতাবিরোধীদের চাকরি না দেওয়া হয় সেজন্য সরকারকে আদেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

এম কে রহমান হটনিউজকে বলেন, এই দলটি স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে, এমনকি আজ ৪২ বছর পরেও তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত নয়। তাই সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে পরিপূর্ণ বিচার করে তাদেরকে নিষিদ্ধ করার জন্য আবেদন জানিয়েছি।

অপরদিকে ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম হটনিউজকে বলেন, ট্রাইব্যুনাল জামায়াতকে নিয়ে যে পর্যবেক্ষনগুলো দিয়েছেন, সেগুলো ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার বর্হির্ভূত। জামায়াতের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, মামলা নেই, অভিযোগ গঠন পর্যন্ত হয়নি।

জামায়াত নিষিদ্ধের এ আবেদন প্রথমত অতি উৎসাহী আবেদন এবং এটি একেবারেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত বলেও মন্তব্য করেন তাজুল।

তিনি দাবি করেন, আপিল বিভাগ কোনো দলকে নিষিদ্ধের জন্য কমপ্লিট জাস্টিস প্রয়োগ করতে পারেন না। কমপ্লিট জাস্টিস করার জন্য একটি দলকে নিষিদ্ধ করাও সুপ্রিম কোর্টের কাজ নয়। আর ট্রাইব্যুনাল কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার রাখেন না। কোনো দলের বিচারে শাস্তি কি হবে সেটা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এ নেই। বিধানটি অসম্পূর্ণ।

অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম আরও বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা এই মামলার সাবজেক্ট ম্যাটার নয়। সুতরাং মূল জায়গায় যেখানে জামায়াত নেই, সেখানে কমপ্লিট জাস্টিসের নামে একটা দলকে নিষিদ্ধ করা হাস্যকর ও অবাস্তব।

অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের আলোকে এ আপিল আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এম কে রহমান।

ট্রাইব্যুনাল গোলাম আযমের রায়ে তার তার পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আসামির (গোলাম আযম) নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর সব নেতা ও কর্মী এবং ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। ওই সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর অধীন সহযোগী বাহিনী (অক্সিলারি ফোর্স) হিসেবে কাজ করে।’

‘অভিযুক্ত আসামি কেবল জামায়াতে ইসলামীর ইসলামী ছাত্রসংঘের সাংগঠনিক কাঠামোই নিয়ন্ত্রণ করেননি, পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি গঠনেও মূল ভূমিকা পালন করেন।’

রায়ের ২৩৪ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বাধীনতাকামী জনগণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য তার লোকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে সুষ্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসাবে গোলাম আযম মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্যারামিলিশিয়া বাহিনী যেমন শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী, আলবদর বাহিনী, আলশামস বাহিনী গঠনে সুপিরিয়র ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। এসব সংগঠনের সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে জামায়াতে ইসলাম ও তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘ।’

অপরদিকে জামায়াত প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ‍রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘তৎকালীন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের নেতা গোলাম আযম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। পাকিস্তান রক্ষার নামে তারা বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল।’

‘পরে জামায়াত সশস্ত্র আলবদর বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করে। তারা নির্বিচারে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে প্রধানত আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধ ঢাকা ১৯৭১’ বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে রায়ে বলা হয়, ‘মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা প্রসঙ্গে এ বইয়ে বলা হয়, প্রথমে জামায়াত তাদের সমমনা-ধর্মান্ধ ইসলামি দলগুলোকে নিয়ে শান্তি বাহিনী গঠন করে। পরে পাকিস্তানি বাহিনীকে পূর্ণাঙ্গ সহায়তার লক্ষ্যে সশস্ত্র রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠন করে। এক পর্যাযে তারা আধা সামরিক এই বাহিনীর জন্য সরকারের স্বীকৃতি আদায়েও সমর্থ হয়।’

‘সশস্ত্র এ বাহিনী দু’টি পাকিস্তানি সৈন্যদের সহায়তায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। এছাড়া তারা বাড়িঘরে আগুন, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অপহরণ এবং সর্বশেষে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।’