জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি সারাদেশ

সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার মইনুলকে নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

হটনিউজ ডেস্ক: টেলিভিশন টক শোতে অংশ নিয়ে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির প্রশ্নের জবাবে তাকে অশালীন, আপত্তিকর মন্তব্য করায় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের কড়া সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। সৌদি আরব সফরের বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করতে সোমবার (২২ অক্টোবর) গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী। তার লিখিত বক্তব্য পাঠ শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মধ্যে ব্যারিস্টার মইনুলের মন্তব্যের বিষয়টিও উঠে আসে। এগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে ব্যারিস্টার মইনুলের আচরণ ও মন্তব্য নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এমনকি এই ঘটনায় মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি মামলায় তিনি এরইমধ্যে হাইকোর্ট থেকে পাঁচ মাসের আগাম জামিন নেওয়ায় সংক্ষুব্ধদের আরও মামলা করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতেই মাছরাঙা টেলিভিশনের এক সাংবাদিক নতুন রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দিকে ইঙ্গিত করে এ ধরনের জোটকে আওয়ামী লীগ কিভাবে মূল্যায়ন করছে এমন প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী এর উত্তরে এমন জোট গঠনকে স্বাগত জানালেও জোটটি কাদের সেদিকেও তাকাতে বলেন। এসময় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের জোট করার সমালোচনার পাশাপাশি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তবে একটু লক্ষ্য রাখা দরকার, কারা কারা এক হলো। সেটাও আপনারা দেখবেন, কে কোন ধরনের, কে কোন চরিত্রের, কার কী ধরনের ভূমিকা, কী ধরনের বাচনিক ভঙ্গি, মেয়েদের প্রতি কে কী ধরনের কটূক্তি করতে পারে সে প্রতিযোগিতাও আপনারা দেখেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘জোটের এমনও সদস্য আছেন যিনি এক নারী সাংবাদিককে যে ধরনের নোংরা কথা বলতে পারেন…তারা সব এক।’

নির্বাচনকালীন সরকারের আকার কেমন হবে এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে সরকার এই মুহূর্তে ছোট করার বিষয়ে ভাবছেন না বলার পর এই সরকারে ব্যারিস্টার মইনুলকে নেবেন কিনা এমন বিষয়েও রসিকতা করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি বলেন, ‘সুশীলরা সুশীলই থাক। তারা মন্ত্রী হলে তো সুশীল পরিচয় মুছে যাবে।’আরেক নারী সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন টক শোতে এক নারী সাংবাদিককে আপত্তিকর অশালীন মন্তব্য করার পর তার বিরুদ্ধে সকালে মামলা হলে বিকালে তিনি জামিন নেন। কিন্তু মধ্যবর্তী সময়ে তাকে গ্রেফতারে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কোনও উদ্যোগ কেন নেয়নি। সরকারে থাকা নারী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরাও এর প্রতিবাদ জানাননি কেন? এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন একটা মামলা হয়, তখন ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়। ওয়ারেন্ট ইস্যুর সঙ্গে সঙ্গে এখানে কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি যখন বিচার বিভাগের, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তো গিয়ে হামলা করতে পারে না। এছাড়া তিনি সেখানে আগাম জামিন চেয়েছেন। কোর্ট তাকে আগাম জামিন দিয়েছেন। তাও পাঁচ মাসের।’

মাসুদা ভাট্টিকে নিয়ে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি এমন একটা জঘন্য কথা বললেন একজন নারী সাংবাদিককে এবং প্রকাশ্যে, সারা বাংলাদেশ কেন, সারা বিশ্ব দেখেছে, কীভাবে তিনি একজন নারী সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একথা বললেন। এখন কোর্ট যেখানে তাকে জামিন দিয়েছেন, সেখানে আমার কিছু বলার নেই। সেক্ষেত্রে আমি বলবো, আমাদের নারী সাংবাদিক যারা আছেন, তারাই বা কী করছেন? একজন (ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন) নারীর বিরুদ্ধে বলেছেন, একটা মামলা না হয় হয়েছে, আরও তো মামলা হতে পারে। এর প্রতিবাদ আপনারা করতে পারেন। আপনারা প্রতিবাদ করুন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা করার করবে।’

এরপর পরের প্রশ্নে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তার দলের নারী সংগঠনগুলোকে এ ইস্যুতে প্রতিবাদ করারও নির্দেশ দেন। দলের এক নারী নেত্রী মামলাও করার কথা বললে প্রধানমন্ত্রী তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেন।এরপর সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুলের সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আবারও মইনুল হোসেনের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকাসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির উদ্দেশে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের সেই কটূক্তি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার বাচনিক ভঙ্গির চেয়ে অ্যাটিটিউট ছিল খুব খারাপ। তার কাছ থেকে আর কী আশা করবেন।’

মাসুদা ভাট্টি ও ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন

এরপর ব্যারিস্টার মইনুল সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন. ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় মইনুল দালালি করে বেড়াতেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর। ইত্তেফাক থেকে সেসময় সিরাজুদ্দিন হোসেন সাহেবকে যে তুলে নিয়ে গিয়েছিল এর জন্য তো তিনিও কম দায়ী নন। অন্তত আমি এটুকু বলতে পারি। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর খুনী মোশতাক একটা দল করেছিল। এই ভদ্রলোক তখন সেই দলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। এরপরে তিনি আবার একটি রাজনৈতিক দল করেন জাতির পিতার হত্যাকারী হুদা, পাশা, শাহরিয়ার এদেরকে নিয়ে। তার কাছে ভালো ভদ্র ব্যবহার আর কী পাবেন?’

প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘শুধু তাই নয়, ইত্তেফাকে মইনুল একটা মার্ডারও করে। নিজে মার্ডার করে নিজের ভাইকে ফাঁসানোরও প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। এমনকি তার কাকরাইলের বাড়ি নিয়েও ঝামেলা আছে। সেখানেও রাষ্ট্র বনাম তার (মইনুল) একটা মামলা আছে’। এসব খবর সাংবাদিকদের খুঁজে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।মইনুল হোসেন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ‘উনি গিয়েছিলেন ব্যারিস্টারি পড়তে। সেই যুগে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়া তো কম কথা না। আমাদের তোফাজ্জল হোসেন মানিক কাকা তাকে ব্যারিস্টারি পড়তে পাঠালেন। আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। যখন যা লাগতো একটা কিন্তু সহযোগিতা হতো, সব হতো। ব্যারিস্টারি পাস করে আসার পর উনি সাহেব হয়ে গেলেন। মানিক কাকা কিন্তু সব সময় পান্তা ভাত খেতেন। পান্তা ভাত খেতে উনি খুব পছন্দ করতেন। আর উনার ছেলে আসলেন সাহেব হয়ে। উনি বাংলাদেশি খাবার খেতে পারেন না, সাহেবি খাবার খেতে হবে। স্বাভাবিক ভাবেই চাচি এসে মায়ের কাছে (বেগম ফজিলাতুন্নেসা) খুব আপসেট হয়ে বলতেন, আমি কী করি? আমার ছেলে এখন ইংরেজি খাবার খাবে। সেই যুগে একশ’ টাকা দিয়ে উনার ইংরেজি খাবার রান্নার জন্য বাবুর্চি রাখা হলো। উনি হলেন সেই কাক যে ময়ূরপুচ্ছ লাগিয়ে যে চলে। উনি বিদেশে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে উনি ইংরেজ হয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই হলো সেই লোক। যিনি খাওয়াটা শিখেছিলেন ঠিকই কিন্তু, ইংরেজদের ভদ্রতাটা শিখে আসেন নাই। কথা বলাটা শিখে আসেন নাই । আরও জানি। সব পরে বলবো।’

এছাড়াও ব্যারিস্টার মইনুলের জামায়াত সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ চেয়ে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে এমন তথ্য সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরলে জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মইনুল হোসেন যে শিবিরের অনুষ্ঠানে গিয়েছেন সেটি তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া ভিডিওতে সবাই দেখেছেন। তিনি তো সেখানে গিয়েছেন। তাহলে তাকে জামায়াত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন করাটায় অন্যায় কিসে? প্রসঙ্গত: গত ১৬ অক্টোবর রাতে ৭১ টেলিভিশনে মিথিলা ফারজানা’র সঞ্চালনায় ‘৭১ জার্নাল’ টকশোতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে প্রশ্ন করেন ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলা হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আপনি জামায়াতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। আপনি আসলে কাদের হয়ে সেখানে প্রতিনিধিত্ব করছেন?’ এর জবাবে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন তাকে বলেন, ‘আপনার দুঃসাহসের জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে আমি চরিত্রহীন বলে মনে করতে চাই।’ পরে ওই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নারী সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্টরা প্রতিবাদ জানালে তাতে রাজনীতিবিদরাও যোগ দেন।এরপর রবিবার (২১ অক্টোবর) ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূরের আদালতে মাসুদা ভাট্টি বাদী হয়ে ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

পাশাপাশি মইনুল হোসেনের একই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রবিবার (২১ অক্টোবর) সকালে তার বিরুদ্ধে জামালপুরের আদালতে ২০ হাজার কোটি টাকার মানহানির মামলা করেন যুব মহিলা লীগের জামালপুর শাখার আহ্বায়ক ফারজানা ইয়াসমীন লিটা। আদালত সে মামলা আমলে নিয়েও ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে কুড়িগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয়েছে। তবে মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানার আগেই ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন দুটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন। এ দুটি মামলায় হাইকোর্ট তাকে পাঁচ মাসের জামিন দেয়। এদিকে, কুড়িগ্রামে একই ঘটনায় একটি নালিশি মামলা দায়ের হলে ব্যারিস্টার মইনুল তাতেও সোমবার হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন।এ মামলার শুনানিতে একই ঘটনায় একাধিক স্থানে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কারণ জানতে চান আদালত। এর জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান,‘উনি একজন নারীকে উদ্দেশ করে যে উক্তি করেছেন তাতে সমগ্র নারী সমাজ আহত হয়েছে, বিক্ষুব্ধ হয়েছে এবং আমাদের দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়েছে। কারণ ওই অনুষ্ঠানটি সমগ্র বিশ্বের সকলেই দেখেছে।’

তবে শুনানি শেষে এ মামলায় আদালত তাকে ৬ সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এরপরেও রংপুরসহ দেশের আরও কয়েকটি জেলায় তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের হয়। সর্বশেষ রংপুরে দায়ের করা মামলায় সোমবার রাত সাড়ে ৯টায় তাকে উত্তরায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ও জেসিডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসা থেকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। সেখান থেকে তাকে তাকে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে।