রাজশাহী লাইফ স্টাইল

কালের সাক্ষী রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর

Rajshahi-barind-BG-72520130808051648রাজশাহী অফিস,হটনিউজ২৪বিডি.কম:ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র জাদুঘর’। রাজশাহী মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র হেতমখাঁ সদর হাসপাতালের সামনে অবস্থিত প্রাচীন সংগ্রহশালা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর ।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রততাত্ত্বিক সংগ্রহশালা এবং বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। বর্তমানে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী আসেন ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন দেখতে। আর প্রতি ঈদ মৌসুমে সেখানে দর্শনার্থীদের ভীড় আরো উপচে পড়ে।

ইতিহাস: নাটোরের দিঘাপতিয়ার রাজপরিবারের বিদ্যোৎসাহী জমিদার কুমার শরৎকুমার রায়, খ্যাতনামা আইনজীবী ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক রমাপ্রসাদ চন্দ্রের প্রচেষ্টায় ১৯১০ সালে এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে তৎকালীন সচেতন মহল ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য উৎসাহী হয়ে ওঠেন, যার ফলে বিস্মৃত প্রায় সাহিত্যিক নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সংগ্রহ ও অনুশীলনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ১৯০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের কাশিমবাজার পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। পরের বছর পরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ভাগলপুরে। শরৎকুমার রায়, অক্ষয় কুমার ও রমাপ্রসাদ উভয় অধিবেশনে যোগ দিয়ে বরেন্দ্রভূমির পুরাকীর্তি সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং পুরাকীর্তি সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে উঠেন।

১০১০ সালে তারা বগুড়া জেলার খঞ্জনপুরে পুরাতাত্ত্বিক অভিযানে যান এবং এর ঐতিহ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য একটি সমিতি গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়ে গঠন করেন বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি। সমিতি অনুসন্ধান চালিয়ে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে কালো পাথরের বিখ্যাত গঙ্গা মূর্তিসহ পুরাতত্ত্বের ৩২টি দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন সংগ্রহ করেন।

সমিতির সম্পাদক রামপ্রসাদ চন্দ সমুদয় নিদর্শন প্রধানত পুরনো স্থাপত্যের নিদর্শন, পুরনো ভাস্কর্যের নিদর্শন ও পুরনো জ্ঞান ধর্ম সভ্যতার নিদর্শন (যেমন পুঁথি)Ñ এই তিন ভাগে বিভক্ত করেন। কুমার শরৎকুমার রায়, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও রমাপ্রসাদ সমিতির ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যক্তিগত যে অর্থ প্রদান করেন তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় কম।

তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার সমিতিকে একশ টাকা করে অনুদান দিতো। এই আর্থিক অনটনের মধ্যে সংগৃহীত নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের জন্য একটি মিউজিয়াম ভবন নির্মাণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে এবং তা ব্যয়বহুল জানা সত্ত্বেও শরৎকুমার বন্ধুদের অনুরোধে নির্মাণ কাজ শুরু করেন। সমিতির কর্মকর্তাদের অনুরোধে তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ১৯১৬ সালের ১৩ নভেম্বর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

নির্মাণ শেষে ১৯১৯ সালের ২৭ নভেম্বর দ্বার উন্মোচন করেন লর্ড রোনাল্ডসে। ১৯৪৭-এর পর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর মারাত্মক দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে। যার ফলে এটি রক্ষা ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনে ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর হস্তান্তর করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে।

বর্তমানে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধীন। ১৯১১ সালে কলকাতা জাদুঘর বরেন্দ্র জাদুঘরের যাবতীয় সংগ্রহ দাবি করেছিল। ফলে এর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। এ প্রেক্ষাপটে তৎকালীন রাজশাহী বিভাগের কমিশনার এফজে মনমোহনের প্রচেষ্টায় বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল বরেন্দ্র জাদুঘর পরিদর্শনে এসে সংগ্রহ দেখে মুগ্ধ হন। ১৯১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি সার্কুলারের মাধ্যমে স্থানীয় জাদুঘরগুলোকে সংগ্রহের বিষয়ে স্বাধীনতা দেওয়া হলে এ জাদুঘরের অস্তিত্ব রক্ষা হয়।

নিদর্শন: জাদুঘরের এ পর্যন্ত সংগ্রহ সংখ্যা সাড়ে আট হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার প্রস্তর ও ধাতবমূর্তি, ৬১টি লেখচিত্র, ২ হাজারেরও বেশি প্রাচীন মুদ্রা, ৯শ’র বেশি পোড়ামাটির ভাস্কর্য-পত্র-ফলক, প্রায় ৬০টি অস্ত্রশস্ত্র, ৩০টির মতো আরবি-ফার্সি দলিল, মোগল আমল থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকারের রৌপ্য-ব্রোঞ্জ-মিশ্র ধাতুর প্রায় ৪০০টি মুদ্রা রয়েছে এখানে। এছাড়াও প্রায় সাড়ে চার হাজারেরও বেশি পান্ডুলিপি আছে। এসব সংগ্রহ মোট ১৪টি গ্যালারিতে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত।

গ্যালারি: ১নং গ্যালারি প্রচীন আমলের ঢাল-তলোয়ার, ধাতবপাত্র, মহেঞ্জোদারো ও মহাস্থানের বিভিন্ন নিদর্শন। সম্রাট অশোক থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত কাঠ, পাথর ও অন্যান্য বস্তু দ্বারা নির্মিত মূর্তিগুলো প্রদর্শিত হয়।

২নং গ্যালারি সূর্য, বিষ্ণু, শিব, কার্তিক ও অন্যান্য দেবতার মূর্তি, পার্বতী, সরস্বতী, মনসা, দুর্গা ও অন্যান্য দেবীর মূর্তি। ৩নং বুদ্ধ গ্যালারিতে সব বুদ্ধ দেব-দেবী ও জৈন মূর্তি, বোধিসত্ত্ব, ঋসভনাথ, পর্শ্বনাথ ইত্যাদি প্রদর্শিত হয়।

এছাড়া সেখানে প্রাচীন আমলের আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত, বাংলা লেখচিত্র এবং পাল যুগ, সুলতানী যুগ, মোগল যুগের শিলালিপি ছাড়াও শেরশাহর ২টি কামান ও মেহরাব প্রদর্শিত হচ্ছে। ৪নং ইসলামী গ্যালারিতে হাতে লেখা কোরআন শরীফ, মোগল আমলের ফার্সি দলিল, পোশাক মুদ্রা ইত্যাদি দিয়ে এই গ্যালারি প্রাচীন ঐতিহ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।

বর্তমানে ৫নং আবহমান বাংলা গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হচ্ছে বাঙালি জাতির ব্যবহার্য জিনিসপত্র, প্রাচীন গহনা, দেশি বাদ্যযন্ত্র, আনুষ্ঠানিক মৃৎপাত্র, উপজাতিদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র। কিশলয় বেষ্টিত নদীমাতৃক বাংলার নৌকার মডেল, অস্ত্রের সূর্য নরম সোনালি রোদ ছড়িয়ে জন্মভূমিকে করেছে অপরূপ সৌন্দর্য, এখানে সেই চিত্র ফুটে ওঠে।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সুলতান আহমদ বলেন- শত বছরের পুরনো এই বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের উন্নয়নের জন্য কাজ চলছে। দীর্ঘ ৪ বছর থেকে এই জাদুঘরের আধুনিকায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এখানে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে জাদুঘরের চিত্র দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বাজেট স্বল্পতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা অতিদ্রুত এর অন্যকাজ শেষ করতে পারবো। কাজ চললেও এখন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী প্রতিদিন আসেন। বর্তমান ৯টি গ্যালারিতে কাজ চলছে। এজন্য এখন ৫টি গ্যালারি দর্শকদের জন্য চালু রয়েছে। এছাড়া জাদুঘরে গিয়ে রাবি শিক্ষার্থীরা গবেষণার কাজ করেন।