ঢাকা প্রধান খবর শিক্ষাঙ্গন

ফল বিশ্লেষণ: নতুন ৩ বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্নের ‘ধাক্কা’

20_HSC+Exam_010413আছাদুজ্জামান, হটনিউজ ২৪.কম:সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষার্থীরা প্রতিটি প্রশ্নের চারটি অংশের উত্তর সঠিকভাবে দিতে না পারার কারণেই এবার এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।এইচএসসি ও সমমানে উত্তীর্ণ ৭৪ শতাংশএর পাশাপাশি পাসের হার কমার জন্য তারা পরীক্ষার মধ্যে হরতাল ও রাজনৈতিক অস্থিরাতাকেও দায়ী করেছেন।সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের একটি অনুচ্ছেদ পড়ে তার ভিত্তিতে চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়। এর মধ্যে ক, খ, গ এবং ঘ প্রশ্নে চারটি ধাপে পরীক্ষার্থীদের জ্ঞান, অনুধাবন ক্ষমতা, প্রয়োগ ক্ষমতা ও উচ্চতর দক্ষতা- যাচাই করা হয়।

সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদটি অধিকাংশ সময় দেয়া হয় পাঠ্য বইয়ের বাইরে থেকে, যাতে পাঠ্য বইয়ে আলোচিত কোনো একটি প্রসঙ্গ থাকে।ঢাকা বোর্ডর প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ রবিউল কবীর চৌধুরী হটনিউজ ২৪বিডি .কমকে বলেন, “পাঠ্যবইয়ের বিষয়ের সঙ্গে হুবুহু মিল না থাকলেও একই ধরনের বিষয়ের আলোকে সৃজনশীল প্রশ্নে কিছু ‘উদ্দীপক’ দেয়া হয়। এই ‘উদ্দীপকের’ ওপর ভিত্তি করেই উত্তর লিখতে হয়।”রাজশাহী বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম এ হুরাইয়রা জানান, ‘জ্ঞান’ এবং ‘অনুধাবনের’ উদ্দীপক প্রশ্নের মধ্যে থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ দুই অংশের উদ্দীপক প্রশ্নে থাকে না।“ফলে নিজস্ব ‘জ্ঞান’ এবং ‘অনুধাবনের’ ভিত্তিতেই ওই ‍দুই অংশের উত্তর লিখতে হয়। অর্থাৎ এখানে শিক্ষার্থীদের মুখস্ত বিষয়গুলোই লিখতে হচ্ছে।”রবিউল জানান, অনেক সময় এক অধ্যায় থেকে ‘ক’ এবং ‘খ’ অংশ এবং অন্য অধ্যায় থেকে ‘গ’ এবং ‘ঘ’ অংশের প্রশ্ন করা হয়। এতেও পরীক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ে।তিনি বলেন, মুখস্তের ওপর নির্ভর করে ‘জ্ঞান’ ও ‘অনুধাবন’ অংশের উত্তর দেয়া গেলেও ‘প্রয়োগ’ বা ‘উচ্চতর দক্ষাতার’ প্রশ্নে সব শিক্ষার্থী পার পায় না। কারণ সেগুলোর উত্তর দিতে হলে প্রশ্ন খুব ভালভাবে বুঝতে হয়।ঢাকা বোর্ডর পরীক্ষা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান সমন্বয়ক রবিউলের মতে, সৃজনশীল প্রশ্নে পাস করা ‘খুব সহজ’ হলেও জিপিএ-৫ পাওয়া ততোটা সহজ নয়। কারণ প্রশ্নের চারটি অংশের উত্তর সবাই দিতে পারে না।তবে সৃজনশীল প্রশ্নের কারণে পাসের হার কমার কোনো কারণ দেখছেন না তিনি।“সৃজনশীল প্রশ্নের জ্ঞান ও অনুধাবন অংশে মাঝামাঝি নম্বর দেয়ার কোনো জায়গা নেই। উত্তর ঠিক হলে পুরো নম্বর, আর ভুল হলে পরীক্ষার্থীরা কোনো নম্বরই পাবে না।”তবে প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা অংশের নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষকের স্বাধীনতা রয়েছে। এই অংশে শিক্ষার্থীরা কম-বেশি নম্বর পেয়ে থাকে, কারণ ‘বেনিফিট অব ডাউট’ পরীক্ষার্থীরাই পায়।সৃজনশীল প্রশ্নে ৬০ নম্বরের রচনামূলক এবং ৪০ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন থাকে। তবে যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা আছে সেসব বিষয়ে ৪০ নম্বরের রচনামূলক, ৩৫ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক এবং ২৫ নম্বর ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত।সৃজনশীল প্রশ্নের তত্ত্বীয় অংশে প্রতিটি প্রশ্নের জন্য ১০ নম্বর বরাদ্দ। ক, খ, গ এবং ঘ অংশের জন্য যথাক্রমে ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর থাকে।সৃজনশীন প্রশ্নের রচনামূলক ও নৈর্ব্যক্তিক অংশে আলাদা আলাদাভাবে পাস করার বাধ্যবাধকতা থাকায় এবার অনেক শিক্ষার্থী ফেল করেছে বলে চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পিযূষ দত্ত জানান।হটনিউজ ২৪বিডি .কমকে তিনি বলেন, একই বিষয়ের দুটি পত্র মিলিয়ে (প্রথম ও দ্বিতীয়) ৭৫ নম্বর পেয়েও এবার অনেকেই ফেল করেছে, যেখানে দুই বিষয় মিলে ৬৬ পেলেই পাস হওয়ার কথা। ওই বাধ্যবাধকতার কারণে পাসের হার কিছুটা কমেছে।এইচএসসিতে এবার পাসের হার ৭৪ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৭৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ।আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ হাজার কমে ৫৮ হাজার ১৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে।শনিবার ফল প্রকাশের পর পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমায় হরতাল ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।শিক্ষা বোর্ডগুলো কর্মকর্তরাও পাসের হার কমার জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই দায়ী করেছেন।২০০৩ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকার ৪৯টি বিদ্যালয়ের ১০ হাজার শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষা নিয়ে পরীক্ষা পদ্ধতিটি যাচাই করা হয়। এতে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় সরকার এ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করে বলে রবিউল জানান।রাজশাহী বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মনে করেন, এবার নতুন তিনটি বিষয়ের পরীক্ষা সৃজনশীল পদ্ধতিতে হওয়ায় ওই তিনটি বিষয়ের প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। পরীক্ষায় এর প্রভাব পড়েছে।এবার এইচএসসিতে ৪১টি বিষয়ের মধ্যে বাংলার সঙ্গে নতুন করে বিজ্ঞানে রসায়ন, মানবিকে পৌরনীতি এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ বিষয়ের পরীক্ষা সৃজনশীল প্রশ্নে হয়।তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় পেছনে রাজনৈতিক কারণকে দায়ী করলেও নতুন বিষয়গুলোতে সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষার্থীরা যে ‘ধাক্কা খেয়েছে’, তা স্বীকার করেছেন।সৃজনশীল প্রশ্নে নেয়া নতুন তিনটি বিষয়ের উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের ‘যথাযথ’ প্রশিক্ষণ না থাকার কথাও উঠে এসেছে সংশ্লিষ্টদের কথায়।এবার সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা বোর্ডে। গড় পাসের হার ৭৪ দশমিক ৩০ শতাংশ হলেও চট্টগ্রামে ৬১ দশমিক ২২ এবং কুমিল্লায় ৬১ দশমিক ২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পিযূষ দত্ত হটনিউজ ২৪বিডি. কমকে জানান, সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষা হওয়ায় পৌরনীতিতে চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার গতবারের চেয়ে অনেক কমেছে।“অন্য বছর পৌরনীতিতে পাসের হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ হলেও এবার পাস করেছে ৭০ শতাংশের মতো শিক্ষার্থী। রসায়ন এবং ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগেও পাসের হার গতবারের চেয়ে অনেক কম।”আর কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়ছার আহমেদ জানান, সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষা হওয়ায় এই বোর্ডে ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ বিষয়ে পাসের হার কমেছে ১০ দশমিক ২০ শতাংশ।এছাড়া পৌরনীতিতে দুই দশমিক ৫ শতাংশ এবং রসায়নে এক দশমিক ৩০ শতাংশ পাসের হার কমেছে বলে জানান তিনি।আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সভাপতি অধ্যাপক তাসলিমা বেগম জানান, বিজ্ঞান বিভাগে রসায়নে পাসের হার এবার অনেক কমেছে।২০১০ সালে তিনটি বিষয়ের পরীক্ষা সৃজনশীল প্রশ্নে দিয়ে আসা শিক্ষার্থীরাই এবার এইচএসসি পাস করল।