জাতীয় বরিশাল

সেমাই চিনি পর্যন্ত কেনার সঙ্গতি নেই তাদের

download (1)মেজবাহউদ্দিন মাননু, নিজস্ব সংবাদদাতা, কলাপাড়া, ০৫ আগস্ট :লালুয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভাঙ্গন কবলিত রামনাবাদ নদীর পাড়ের সহ¯রাধিক কৃষক পরিবারে ঈদের আনন্দ নেই। এসব পরিবারের কর্মক্ষম মানুষগুলো বেকার হয়ে গেছে। দীর্ঘ তিনটি মাস এসব পরিবার পানিবন্দী হয়ে এমন দুর্দশায় পড়েছেন। হাইলা-কামলার কাজ নেই। সংলগ্ন নদীতে মাছ মেলে না। কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত তিন হাজার পরিবারের। এবছর এদের আমন আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। বাড়িঘর থেকে রান্না করার চুলা পর্যন্ত ডুবে যায় জোয়ারের পানিতে। ১২ টি গ্রামের সকল শ্রেণীর মানুষের এমন দুর্দশা চলছে। এখন এসব পরিবারে চরম খাদ্য সঙ্কট চলছে। শ্রমজীবি অধিকাংশ পরিবারের বসবাস এই গ্রামগুলোয়। পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা জানান, ঈদে স্ত্রী-সন্তান থেকে শুরু করে মা-বাবার জন্য নতুন কোন কাপড়-চোপড় কেনার সঙ্গতি নেই তাদের। অবস্থা এমন চলছে যে তিনবেলা দু’মুঠো ভাতের সংস্থান এরা করতে পারছে না। চোখে না দেখলে এসব পরিবারের দুরাবস্থা বোঝার উপায় নেই। সরকারিভাবে মহাসেন তান্ডব পরবর্তী সময় ৭/৮ কেজি করে চাল কিছু কিছু পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এরপর আর সরকারি বেসরকারি কোন সংস্থা এদের কোন খোঁজ-খবর নেয়নি।

লালুয়া ইউনিয়নের রাক্ষুসে রামনাবাদ নদী এসব গ্রামের মানুষের জমিজমা গিলে খেয়েছে বহু আগে। এখন অধিকাংশ পরিবার ওই রামনাবাদ নদীতে মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর যাদের জমিজমা রয়েছে তারা কৃষিকাজ করেই কোনমতে জীবিকার চাঁকা ঠেলছিলেন। কিন্তু মহাসেন থেকে পরবর্তী সময়ে প্রায় তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে জলোচ্ছ্বাসে ডুবে যায় এসব গ্রামের সবকিছু। মানুষের এই দশা চলছে অন্তত তিনমাস আগে থেকে। প্রতিদিন অস্বাভাবিক জোয়ারে ভাসছে দুইদফা। চারিপাড়া, দক্ষিন চারিপাড়া, পশুরবুনিয়া, ছোটপাঁচনং, বড়পাঁচনং, নাওয়াপাড়া, মুন্সিপাড়া, চৌধুরীপাড়া, কলাউপাড়া, চান্দুপাড়া গ্রামের মানুষের এমন দুরাবস্থার যেন শেষ নেই। মানুষ এখন বাড়িঘরে পর্যন্ত থাকতে পারছেনা। নিরাপদ খাবার ও ব্যবহারের পানি পর্যন্ত নেই। গ্রামের অভ্যন্তরীণ পুল কালভার্ট গেছে বিধ্বস্ত হয়ে। সামনে ঈদের দিনটিতে এসব পরিবার সন্তানদের নিয়ে নতুন জামা-কাপড় তো দুরের কথা- একপ্যাকেট সেমাই ও চিনি কিনে খাওয়ানোর সঙ্গতি পর্যন্ত এদের নেই।

সোমবার দুপুরে এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায় এসব অসহায় মানুষের দুরাবস্থার চিত্র। নাওয়াপাড়া গ্রামের মোশাররফ গাজী জানালেন, মাসহ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তার সাতজনের সংসারে এখন দুরাবস্থার যেন শেষ নেই। নদীতে মাছ মেলেনা তাই মোশাররফ বেকার। বাড়িঘর পানিতে ডুবছে আর ভাসছে। ঈদের কোন কেনাকাটা করতে পারেনি এই মানুষটি। তার সোজাসাফটা কথা ‘ ঈদের কেনাকাটা তো দুরের কথা, সকলের মুখে দেয়ার দুই বেলা ভাতের যোগান মেলোতে পারছেন না।’ প্রায় তিন মাস বেকার হয়ে অন্তত ৩০ হাজার টাকা কর্জ করেছেন মোশাররফ। এখন আর তাও পাওয়া যাচ্ছে না। একই গ্রামের সোনা গাজী, জুয়েলের অবস্থাও তাই। বিধবা মহিনুর, মাসু বেগম তো দুই চোখে অন্ধকার দেখছেন। শিপলু গাজী এখন গেছেন দিশাহারা হয়ে। জানা গেল গ্রামটির অন্তত ৬০টি পরিবারে ঈদের সেমাই চিনি পর্যন্ত জোটবেনা। চারিপাড়া গ্রামের ইউপি সদস্য মজিবর প্যাদা জানালেন, তার গ্রাম থেকে অন্তত ৭০ টি পরিবার ঈদ করতে পারছে না। এদের এখন তিনবেলা ভাতের যোগান নেই। এক দুই দিনের মধ্যে এসব দুর্গত গ্রামের এক তৃতীয়াংশ পরিবার সরকারের দেয়া বিশেষ ভিজিএফ এর চাল পাওয়ার কথা। বাকি পরিবারের ভাগ্যে কিছু জোটবে না। ১০ কেজি করে চাল সরকারিভাবে বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু দেয়া হয় সাড়ে সাত কেজি করে। মোট কথা এসব পরিবারের মধ্যে ঈদ উপলক্ষ্যে চালসহ নগদ অর্থ বিতরণ করা জরুরি প্রয়োজন। নইলে ঈদের উৎসব থেকে বঞ্চিত থাকবে রামনাবাদ পাড়ের সহ¯্রাধিক পরিবার। এদের ভাগ্যে এবছর জোটবে না ঈদের আনন্দ।