অপরাধ জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর সারাদেশ সাহিত্য

জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, বললেন দীপনের বাবা

 রাকিবুল ইসলাম রাকিব,হটনিউজ২৪বিডি.কম,ঢাকা: দুই বছরেও প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার বিচার শুরু না হওয়ায় শোকবিহ্বল তার বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায় যে কান্নাকাটি দেখি, এর কি কোনও প্রতিকার আছে? এগুলো দেখে কষ্ট পাই, জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরকারের কাছে বিচার চেয়ে কোনও লাভ আছে?’
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর বিকালে ঢাকার শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে জঙ্গিরা। এই ঘটনায় তার স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান ওই বছরের ২ নভেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন। এর নম্বর ৩। পরবর্তীতে মামলাটি তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দক্ষিণ বিভাগ।
মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে হটনিউজ২৪বিডি.কম’র কাছে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি বলেন, ‘আমরা পত্রপত্রিকা থেকে যতটুকু খবর পাই সেটুকুই। জাতীয় কর্তব্য মনে করে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে লেখা উচিত। শুধু এটাই নয়, আরও অনেক মৃত্যুই ঘটেছে। এগুলো সম্পর্কে লেখা উচিত। শুধু তথ্য না। বিচার কেন হচ্ছে না তা নিয়েও লিখতে হবে। আমি চাই শুভবুদ্ধির উত্থান। শুভবুদ্ধির উদায় হোক। শুভবুদ্ধি আর অশুভবুদ্ধি কি তা নিয়ে প্রতি বছর বারবার বলা উচিত। রাজনীতি, অর্থনীতি সবক্ষেত্রেই অশুভবুদ্ধির কর্তৃত্ব চলছে। এজন্য সবার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া জরুরি।’

ছেলের মৃত্যুতে শোকাহত বাবা আরও বলেন, ‘আমার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর কোনও তথ্য নেই। গোয়েন্দারা যা জানান সেটুকুই। এক বছর আগে থেকে জানি তিন জন আসামি ধরা পড়েছে। আরও চার আসামি পলাতক। তাদের ধরতে পারলে চার্জশিট দেওয়া হবে। এক বছর ধরে কিছুদিন পরপর এটুকুই জানতে পারছি। আর কোনও অগ্রগতি নেই।’

মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমি সবসময় তদন্তকারীদের সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত। এটি আর দশটি হত্যাকাণ্ডের মতো নয়। তারা মতপ্রকাশের জন্য খুন হয়েছে। যদি তারা অন্যায় কিছু করে থাকে তাহলে আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারতো। কিন্তু তাদেরকে হত্যা করার কোনও অধিকার কারও ছিল না।’

পুরান ঢাকায় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নাজিম উদ্দিন খুনের উদাহরণ দিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘তার পরিবার অনেক দরিদ্র। তারা বলেছে তাদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে মামলা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তারা তাদের ছেলেকে ফিরে পেতে চান। কিন্তু আর টাকা খরচ করে কি পরিবার কিছু করতে পারবে? সুতরাং এসব হত্যাকাণ্ডে পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের উচিত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও আরও সহানুভূতিশীল হওয়া।’

‘এ দেশে বিচার বলে কিছু নেই’ এমন মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দীপনের লাশ দেখার দিন থেকেই বলছি, আমি বিচার চাই না। তাছাড়া দীপন হত্যার বিচার করলে এখন আমাদের পরিবারের কোনও লাভ নেই। কারণ আমরা তো আর তাকে ফিরে পাবো না। বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। এটা যদি আমাদের পারিবারিক ঝগড়া বা কলহের জন্য হতো তাহলে আমাদের লাভ-লোকসানের বিষয় আসতো। পরিবারের লোক কি আসামিকে শাস্তি দিতে পারবে?’
দীপনের বাবার ভাষ্য, ‘দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে। এত হত্যা, মৃত্যু, আত্মহত্যা ঘটেছে যেগুলোর প্রকৃত অপরাধীদের পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ বের করতে পারে না। দেশে আইনের শাসন ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিচার হওয়া দরকার।’
এত মৃত্যুর ঘটনাকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন এই অধ্যাপক। তার ভাষ্য, ‘সরকারের কর্তব্য হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা, আসামিদের শাস্তি দেওয়া ও তাদের দমন করা।’
দীপন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ফজলুর রহমান বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলো— মঈনুল হাসান ওরফে সিফাত ওরফে ইমরান, আব্দুর সবুর ওরফে আব্দুর সামাদ ওরফে সাদ ও খায়রুল ইসলাম ওরফে জামিল ওরফে রিফাত ওরফে ফাহিম ওরফে জিসান। তারা সবাই আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।’

গোয়েন্দা পুলিশের এই পরিদর্শক বলেন, “হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে ১০-১২ জন। তাদের মধ্যে দীপনের অফিসের ভেতরে অর্থাৎ জাগৃতিতে প্রবেশ করেছিল চার জন। তাদের মধ্যে দু’জন তাকে কুপিয়েছে, বাকি দু’জন তাকে ধরে রেখেছিল। অল্প সময়ের ভেতরেই হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যায় তারা।”

এক বছর আগে দীপন হত্যা মামলায় তিন জন গ্রেফতার হয়। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, ‘বাকিদের গ্রেফতারের পর আর তদন্তের আরও কিছু বিষয় বাকি রয়েছে। সেগুলো সম্পন্ন হলে মামলাটির চার্জশিট দেওয়া হবে।’

দীপন হত্যার দিনই লালমাটিয়ায় আরেক প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে এর কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিন জনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। ওই দুই প্রকাশনা থেকেই বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশিত হয়েছে, যিনি ওই বছরই একইভাবে খুন হন।