জাতীয় ঢাকা

গরীবের কি আর ঈদ আছে?

station-bg20130801190011স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,হটনিউজটোয়েন্টিফোরবিডি.কম,ঢাকা: কদিন পরেই সন্ধ্যার মেঘমুক্ত আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখার অপেক্ষায় আছে সবাই। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ‘চাঁদ দেখা গেছে’ ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেডিও, টেলিভিশনে বেঁজে উঠবে ‘ও মন রমজানের এই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…।’

নিঃসন্দেহে ঈদ আনন্দের, ঈদ সবার। সেই ঈদের দিনটিকে বিশেষভাবে উপভোগ করতে সব শ্রেণী-পেশার মানুষেরাই পোশাক-পরিচ্ছেদ, খাবার-দাবারে কিছু বাড়তি আয়োজনের ব্যবস্থা করে থাকে।

সেই বাড়তি আয়োজনের ব্যবস্থা করতেই বাড়তি শ্রমে বাড়তি কিছু উপার্জন করতে মাঝরাত থেকেই কমলাপুর স্টেশনে আছেন মামুন। পুরো নাম বায়তুল আল মামুন। স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন নারায়ণগঞ্জে। এক বোনও থাকেন পাশাপাশি এলাকাতেই।

ক্রাউন বাল্ব কোম্পানিতে কাজ করেন মামুন। মাসোহারা পান আট হাজার টাকা। প্রতি শুক্রবার ছুটি। এমনিতে ছুটির দিনটিতে পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে বিশ্রামেই কাটান। কিন্তু কদিন পরেই যে ঈদ! মেয়ের জন্য পোশাক কিনতেই হবে, প্রিয়তমা স্ত্রীর নতুন একটা শাড়ী। নিজের জন্যে কিছু একটা কিনতে পারলে ভাল, না হলে দুঃখ নেই।

তাছাড়া ঈদের দিনটিতে প্রাত্যহিক খাবারের বাইরে একটু সেমাই আর পোলাও-মাংসের ব্যবস্থা যদি করা যায় সে চেষ্টাতেই মাল টানতে কমলাপুর স্টেশনে এসেছেন মামুন।

মামুন জানালেন, তার বর্তমান বয়স ঊনত্রিশ। শরীয়তপুরের জুজির হাট থেকে দশ/বারো বছর আগে প্রথম ঢাকায় এসে এই স্টেশনেই মাল টানার কাজই করতেন। সেই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে বাড়তি উপার্জনের আশায় আবারো এসেছেন কমলাপুরে। ট্রেনে চলাচলকারী যাত্রীদের মালপত্র টেনে যদি কিছু পাওয়া যায়, মন্দ কি?

প্লাটফর্মেই দেখা ও কথা হয় মামুনের মতো আরো দুজনের সঙ্গে। নেত্রকোনার সুসং দূর্গাপুর থেকে আসা মো. খোকন ও বারেক মিয়া যাবেন ফেনী। জয়দেবপুর থেকে লালমনিরহাট এক্সপ্রেসে ঢাকায় পৌঁছেছেন রাত ১২টায়।
ঢাকার উদ্দেশে যে বাসে চড়েছিলেন জয়দেবপুর এসে তা নষ্ট হয়ে যায়। বাসের কন্ট্রাক্টর বাকি পথের জন্য কোনো ভাড়া ফেরত না দেওয়ায় স্টেশনে এসে তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে উঠেন। অবশ্য সেজন্য জরিমানা কিংবা কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয়নি তাদের।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। প্লাটফর্মে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই রেলওয়ের নিরাপত্তারক্ষী দুই আনসার সদস্যের কবলে পরেন তারা।

খোকন জানান, দুই আনসার টিকেট চাইলে তারা টিকেট দেখাতে ব্যর্থ হয়। পরে রক্ষা পেতে প্রথমে ৭০ টাকা দেয় খোকন। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে খোকন এবং বারেকের শরীরে তল্লাশি চালিয়ে চারশ টাকা পান নিরাপত্তারক্ষীরা। অনেক কাকুতি-মিনতির পর একশ টাকা ফেরত দিয়ে বাকিটা পকেটস্ত করেন দুই আনসার সদস্য। এখন কিভাবে ফেনী যাবেন সে দুশ্চিন্তা তাদের চোখে-মুখে।

ফেনী কেন যাচ্ছেন? জানতে চাইলে খোকন-বারেক জানান, এলাকায় কাজ নাই। এই সময়টায় ওইখানে কাজ থাকে। রোজগারও ভাল হয়। তাছাড়া প্রতি বছরই কৃষি শ্রমিক হিসেবে তারা ওই এলাকায় যান।

ঈদের প্রসঙ্গ আসতেই খোকন মিয়া মুখে খানিকটা হাসি মাখিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই ঈদো দ্যাশে থাকতারতাম না (থাকতে পারব না)। কুরহানির (কুরবাণীর) ঈদো আরেকবার যায়াম (যাব)। গরীবের কি আর ঈদ আছে?’’

স্টেশনের টিকিট কাউন্টারগুলোর সামনেই গোল হয়ে বসা ছিলেন জামালপুরের আশাদুল আলম, আমানুল্লাহ, ফকির আলী, মো. রাশেদ। তারা একসঙ্গে এসেছেন নোয়াখালী থেকে। জামালপুরের আরো অনেকের সঙ্গে তারাও ফেরি করে প্লাস্টিক সামগ্রী বিক্রি করেন।

বৃষ্টির কারণে বিক্রি ভাল না বলেই কদিন আগেই বাড়ি ফিরছেন। এমনিতে দেড়মাস পর পর বাড়ি যান।

স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবার জন্য কেনাকাটা করেছেন কিনা জানতে চাইলে প্রায় সমস্বরেই সবাই বলে উঠলেন, ‘ক্যামনে কিনুম, জিনিষপত্রের যে দাম! আগে আল্লা আল্লা কইরা বাড়িত যাই। অহন তো ঈদের পর দুইদিন হরতাল দিসে। আগে জানলে দুইদিন পরে আসতাম।’

কথা বলার সময়েই পাপড় নিয়ে হাজির হলেন নারায়ণগঞ্জের মো. মুজিবুর রহমান। ১৯৮৮ সাল থেকে তিনি এ কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে এখন তিনজনের সংসার। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন দুই বছর আগে।

হৃদরোগে আক্রান্ত মুজিবুর ট্রেনে, স্টেশনে পাপড় বিক্রি করেই সংসার চালান। এর মধ্য থেকেই ছেলের লেখাপড়ার খরচ এবং নিজের ওষুধের খরচ যোগাতে হয় তাকে। প্রতিমাসে দুই হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। তাই বাড়তি রোজগারও নাই।

রোজার মাস হওয়ায় দিনের বেলায় পাপড় নিয়ে বের হন না। তাই অন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ বিক্রি হতো তাও হয়নি সারা মাস। এরই মধ্যে কিছু টাকা ধার করেছেন। ওষুধ আর প্রতিদিনের বাজার করেই তাও শেষ। তাই স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে ঈদের দিন একটু ভাল খাওয়ার আশায় পঞ্চাশোর্ধ্ব রোগাক্রান্ত মুজিব মাঝরাতেও কমলাপুরে পাপড় বিক্রি করছেন।