জাতীয় ঢাকা

খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন

Shariatpur River Erosion Pic-1মোঃ বোরহান উদ্দিন রব্বানী,শরীয়তপুর: নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে শরীয়তপুরের পদ্মা পাড়ের হাজার হাজার মানুষ। গত ৩ দিনের পদ্মা গর্ভে বিলীন হয়েছে গেছে প্রায় ৩ শতাধিক পরিবারের বসত বাড়ী। সহায় সম্বল হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে শত শত পরিবার। ভাংগনের কবলে পড়ে বাড়ি ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে ক্ষতিগস্ত পবিরারগুলো। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঘরবাড়ী হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে ভাংগন কবলিত এলাকার মানুষ। সাহায্যের হাত নিয়ে এখনো এগিয়ে আসেনি কোন সরকারী বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় সূত্রে ও সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের সাহেবেরচর, পাঁচগাও, চরজুজিরা, সাধুর বাজার, ওয়াপদা বাজার, ওয়াপদা লঞ্চঘাট, বুন্নাগ্রাম সহ আশেপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় গত ২ সপ্তাহ যাবৎ পদ্মা নদীতে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। তবে গত মঙ্গলবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্ষন্ত বিকেল পর্যন্ত এ ভাঙ্গন তীব্রতর আকার ধারণ করেছে। এলাকাবাসী জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯ টার সময় পদ্মাতীরের চর জুজিরা গ্রামের খানকান্দি এলাকায় হঠাৎ করে শোঁ শোঁ শব্দ করে নদী ভাঙ্গন শুরু হয়। এক সাথে কমপক্ষে এক বিঘা জমি বিকট শব্দ করে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

নদীর ভয়াবহ গর্জনে এলাকার সকল পরিবারের নারী ও শিশুরা ডাক চিৎকার দিয়ে তারা ঘরের বাইেের নেমে আসে। নদী ভাঙ্গনের বেগতিক অবস্থা দেখে নারী ও পুরুষরা মিলে তাদের ঘর দরজা ভাংতে শুরু করে। সারা রাত ধরে কম পক্ষে দুই শতাধিক পরিবার তাদের ঘর বাড়ি ভেঙ্গে অন্যত্র সরিয়ে নেয়। বুধবার সারা দিন তারা পার্শবর্তী এলাকার আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় ঘর দরজা ও আসবাবপত্র ভেঙ্গে নিয়ে রাস্তার পাশে নিয়ে জমা করতে থাকে। এছাড়া জাজিরা উপজেলার কলমির চর, কুন্ডেরচর, পালের চর এলাকায় ভাংনে শতশত পরিবারের ঘর বাড়ি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

এ সময় লোকজন তাদের ভাঙ্গা ঘর বাড়ি নিয়ে রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে বসে থাকে। কোথাও তাদের মাথা গোজার ঠাই মিলেনি । কোথায় যাবে তাও কেউ জানেনা। বৃহস্পতিবারও দেখা গেছে ভাঙ্গন আতঙ্কে শত শত মানুষ তাদের ঘর-দরজা, দোকানপাট অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। কেটে ফেলছে মূল্যবান গাছ।

মাত্র ১০ দিন আগেও এলাকার সহা¯্রাধিক মানুষ নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে বাচার জন্য বেঁড়ী বাধের দাবীতে পদ্মার তীরে মানববন্ধন করেছে। শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সুরেশ্বর দরবার শরীফ থেকে পাঁচগাও চন্ডিপুর লঞ্চঘাট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার এলাকায় ১৩ কোটি টাকা ব্যায়ে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা বাধ নির্মান করা হয়। একই সাথে ভাঙ্গন কবলিত এলাকার জন্য ও ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাধ নির্মানের দরপত্র আহবান করা হয়। কিন্তু অর্থ ছাড় না পাওয়ার কারনে কর্তৃপক্ষ কার্যাদেশ প্রদান না করায় ঠিকাদার কাজ করতে পারেনি। তাই এই এলাকাটি ভাঙ্গনের শিকার হয়েছে।

মঙ্গলবার রাত থেকে চর জুজিরা এলাকার ইয়াকুব মাঝি, আমান উল্লাহ খান, মনু মিয়া খান, ইউসুফ খান, মোসলেম হাওলাদার, মুনসুর হাওলাদার, আবুল কালাম আকন, নিজাম আকন, আলাউদ্দিন মাঝি, মুনু বিবি, আলী আহমদ মাঝি, হালিম মাঝি, আলী হোসেন মৃধা, জাকির হোসেন মৃধা, আলাউদ্দিন শেখ, রহিম বক্স ছৈয়াল, ইসমাইল খান, সামসুদ্দিন মাদবর, আবুল হাসেম বকাউল, ওয়ালি উল্লাহ বকাউল, সেকান্দার মাঝি, ফরিদা বেগম, আকবর আলী খান, মাসুদা বেগম, মোসলেম দেওয়ান, ফজল কাজী, আলাউদ্দিন বেপারী, রোকেয়া বেগম, নুরুল ইসলাম বেপারী ও লালচান ঢালী সহ শতাধিক মানুষের বসত ফিটা ও ফসলী জমি সর্বগ্রাসী পদ্মা গর্ভে হারিয়ে গেছে। এ ছাড়াও সাহেবেরচর গ্রামের, অন্তত ২৫টি পরিবারের ভিটা বাড়িও বিলীন হয়েছে গত এক সপ্তাহে। ওয়াপদা বাজার, ওয়াপদা লঞ্চঘাট ও সাধুর বাজারের ৪০/৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘর ভেঙ্গে নিয়ে গেছে পদ্মা নদী। ভাংগন কবলিত নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের ত্রান তহবিল থেকে ২১ মেঃটন চাল বিতরন করা হয়েছে।

 

চরজুজিরা গ্রামের আমেনা বেগম বলেন, মঙ্গলবার রাতে আমরা ইফতারের পরে নামাজ পরে ভাত খেতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় আনুমানিক রাত ৯ টার দিকে পদ্মার শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পাই। হঠাৎ বিকট শব্দে দেখি আমাদের বাড়ির পাশের অনেক খানি জমি নদীতে টান মেরে নিয়ে গেল। ৫/৭ হাত উচু হয়ে ঢেউ আসতেছিল। ভয়ে আমরা সবাই বাইরে এসে ডাক চিৎকার দেই। বাড়িতে কোন পুরুষ ছিলনা। তারা তারাবী নামাজে ছিল। এর পর সারা রাত ধরে আমরা ঘর ভেঙ্গেছি। রাস্তার পাশে রেখেছি। কোথায় আমাদের ঠাই হবে কিছুই জানিনা”।

একই গ্রামের আতাউর রহমান বলেন, রাতের অন্ধকারে পদ্মার ভাঙ্গনে আমাদের বাড়ির সবগুলো ঘর ও গাছ- পালা নদীতে বিলীন হয়েছে। নিজেদের জীবন টুকু ছারা আর কিছুই বাচাতে পারিনি। কোথায় যেয়ে থাকবো, সামনে ঈদ, কিভাবে ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঈদ করবো তাও জানিনা।

কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ঈমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, কেদারপুর ইউনিয়টির বেশীরভাগই নদীতে ভেঙ্গে নিয়ে গেছে। যতটুকু এখন ও টিকে রয়েছে তা রক্ষা করার জন্য একটি বেড়ী বাধ নির্মাণ করতে সরকারকে জোর অনুরোধ করছি।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল খালেক বলেন, বতর্মান ভাঙ্গন কবলিত এলাকাটির তীর সংরক্ষনের জন্য আরো আগেই একটি টেন্ডার হয়েছে। সরকার টাকা ছাড় না দেয়ার কারনে ঠিকাদার কাজ করতে পারেনি।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক রাম চন্দ্র দাস বলেন, আমরা ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ২১ মেঃটন বরাদ্দ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে দ্রুত বিতরন করা হবে । ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরী করছি। দূর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রনালয়ের কাছে চিঠি লিখেছি ত্রান ও ঢেউ টিন বরাদ্ধের জন্য। আশা করি সরকার অচিরেই এই ত্রান সরবরাহের ব্যবস্থা করবেন।