অপরাধ জাতীয় ঢাকা সারাদেশ

রং বদলায় গাড়ি ফিট হয় না

হটনিউজ ডেস্ক: সোমবার বেলা সোয়া ১২টায় জয়কালী মন্দির সংলগ্ন ভূমি অফিসের সামনে সড়ক মোহনার ঘটনা। গুলিস্তান-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ রুটের আনন্দ ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের একটি বাস (নম্বর ঢাকা মেট্রো ব-১১-৪০৩৮) সড়ক মোহনা থেকে বাঁয়ে গুলিস্তানের দিকে না গিয়ে ডানে মতিঝিলের দিকে মোড় নিলো। চালক নির্ধারিত গন্তব্যের পরিবর্তে ভিন্ন দিকে যেতে চাইলে যাত্রীরা প্রবল আপত্তি জানান। চালক বলেন, ‘অসুবিধা আছে। গাড়ির কাগজপত্র নাই। সামনে মোবাইল কোর্ট বইছে। ধরলে বাস তো আটক করবোই, আমারেও জেলে পাঠাইবো।’

যাত্রীদের হৈচৈ শুনে সড়ক মোহনা থেকে ছুটে আসেন সেখানে দায়িত্বে থাকা ওয়ারী থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) তারিকুল। ‘গুলিস্তানের গাড়ি গুলিস্তানে যাও। অন্যদিকে যাইতে পারবা না’- বলে বাসটি থামিয়ে দেন তিনি। কিন্তু চালক বাসটি ঘুরিয়ে গুলিস্তানে যেতে রাজি নয়। বাসের এক যাত্রী পুলিশের সঙ্গে কথা বললেও লাভ হয়নি। চালক জোর করেই বাসটি নিয়ে যায় মতিঝিলের দিকে।

বাধ্য হয়ে ২৫-৩০ জন যাত্রী বাস থেকে নেমে গুলিস্তানের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। যাওয়ার সময় মাজেদা নামের এক বৃদ্ধা বলেন, ‘দেশে কি আইন-কানুন আছে? বাসে উঠলাম গুলিস্তানে যাওয়ার জন্য। আর ড্রাইভার আমাগো জয়কালী মন্দির নামাইয়া দিলো। ভারী ব্যাগ আর বাচ্চাটা লইয়া যামু ক্যামনে?’

পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এই প্রতিবেদক। এসময় পুলিশ কর্মকর্তা তারিকুল বলেন, ‘দেখলেন তো, কত চেষ্টা করলাম বাসটারে গুলিস্তান পাঠাইতে। কিন্তু ড্রাইভার কিছুতেই শুনলো না। আমি আর কী করুম? আমার তো মামলা করার ক্ষমতা নাই। থাকলে নিশ্চয়ই মামলা কইরা দিতাম, তা বাস মালিকরা যতই ক্ষমতাধর হোক।’

ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারণে শুধু আনন্দ ট্রান্সপোর্ট নয়, রাজধানীতে চলাচল করা আরও বেশ কিছু কোম্পানির বাস এভাবে মাঝপথে যাত্রীদের ফেলে চলে যাচ্ছে অহরহ। তারা না মানছে ট্রাফিক আইন, না মানছে মোটরযান আইন। আইন না মেনে দিনের পর দিন রাজপথে চলাচল করছে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাস।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় হলে লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো ওয়ার্কশপে চলে যায়। এগুলোকে ঘষেমেজে রং করা হয়, পরিবর্তন করা হয় গ্লাস, ইন্ডিকেটর বাতি ইত্যাদি। এভাবে বাসের পুরোনো বডিকে একেবারে নতুন করে ফেলা হয়। জাল কাগজপত্র তৈরি করে আবারও রাস্তায় নেমে পড়ে এগুলো। আসলে লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো ফিট হয় না, কেবল রং বদলায়।

এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ  বলেন, ‘শহরের গণপরিবহনে অনিয়ম আছে, এটা ঠিক। কিন্তু সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা সেগুলো নেই। যেমন শহরে একটা সিটি টার্মিনাল নেই, রাস্তায় টিকিট বিক্রির কাউন্টারের জায়গা নেই। এ কারণে কিছু বাস মালিক সুযোগ বুঝে অনিয়ম করে থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মোবাইল কোর্ট আইন অনুসরণ করে চলছে, এ বিষয়ে আমাদের বলার কিছু নেই। তবে আজই আমরা মালিকদের উদ্দেশ্যে সার্কুলার জারি করেছি। এতে বলা হয়েছে, যেসব বাসে বাম্পার লাগানো হয়েছে সেগুলো খুলে ফেলতে হবে, সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করতে হবে, অতিরিক্ত সিট সরাতে হবে।’

জানা গেছে, গত ৫ মার্চ থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে নগরীতে ধারাবাহিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত চলছে। এতে অংশ নিচ্ছে ডিএসসিসি, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ। ফিটনেস সার্টিফিকেট, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি পরীক্ষা করছে আদালত। কাগজপত্র ঠিক না থাকলে গাড়ি আটকের পাশাপাশি চালকদের জেল-জরিমানা সহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সমন্বয়কারী ও ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘২০ বছরের পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত চলছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি পেলে সঙ্গে সঙ্গে আটক এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে চালকদের কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। নগরীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

ডিএসসিসি জানিয়েছে, এ মাসে ১২ দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সোমবার পর্যন্ত ৫১টি গাড়ি আটক করে ডাম্পিং করা হয়েছে। এসব গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা ও জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালানোর অপরাধে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৪৭ চালককে। এছাড়া বিভিন্ন গাড়ির বিরুদ্ধে ৬৪৬টি মামলা দায়ের এবং ১৩ লাখ ১৯ হাজার ৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।