আন্তর্জাতিক জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর সারাদেশ

‘মানবতার নিষিদ্ধ দরজা’ ফাতেমার জন্য যেভাবে খুলে গেল মার্কিন

হটনিউজ ডেস্ক:  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বেশ কিছু দিন ধরে আটকে ছিল একটি মানবিক প্রশ্ন। ফাতেমা নামের চার মাসবয়সী এক সদ্যোজাত শিশুর সুচিকিৎসা নিশ্চিতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আবশ্যিকতা থাকলেও ট্রাম্পের মুসলিম নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিল তার পরিবার। অবশেষে মার্কিন মানবতার ‘নিষিদ্ধ দরজা’ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে সমর্থ হয়েছে শিশুটি।

এখন অরিগনের স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত পোর্টল্যান্ডের শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ফাতেমা নামের শিশুটি। কিন্তু কিভাবে নিষেধাজ্ঞার পরও যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে সমর্থ হলো শিশুটি? যুক্তরাষ্ট্রে  মানবিক প্যারলে বিশেষ ভিসার সে সুযোগ রয়েছে, তা কাজে লাগিয়েই ভিসার ব্যবস্থা করা হয় ফাতেমার। নিশ্চিত হয় তার চিকিৎসার অধিকার। তবে এ জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ওই শিশুটির বাবা-মাকে।

ফাতেমার চাচা ও দাদা-দাদি ওরিগনে বসবাস করেন। তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। সে কারণে ফাতেমার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করেন তারা। অস্ত্রোপচারের বিষয়ে জরুরি আলোচনার জন্য ওরিগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (ওএইচএসইউ) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে পর্যটক ভিসার জন্য কাগজপত্র তৈরি করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। জানুয়ারির শেষ দিকে মার্কিন দূতাবাসে ভিসার জন্য সাক্ষাৎকার দিতে দুবাই সফর করে ফাতেমার পরিবার। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা। ২৭ জানুয়ারি ইরানসহ সাতটি দেশের মানুষের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এ নিষেধাজ্ঞার পর ভিসা ইস্যুতে মার্কিন দূতাবাসের সাক্ষাৎকার পর্ব বাতিল করা হয়।

এ ব্যাপারে ফাতেমার চাচা স্যাম তাঘিজাদেহ স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কেপিটিভি নিউজকে বলেন, ‘এটি এক দুঃস্বপ্নের মতো। সব কাগজপত্র, সবকিছু প্রস্তুত ছিল এবং একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে তারা সবকিছু বাতিল করে দিলো। যত দ্রুত সম্ভব ওর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। তারা অপেক্ষা করতে পারবে না আপনারা জানেন। এমনকি আমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছি, তারা দুই বছর বা তার বেশি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবেন কিনা। তারা না বলে দিলেন। যত দ্রুত সম্ভব এ চিকিৎসা করাতে হবে।’

শুক্রবার সকালে ফাতেমার পরিবারের আইনজীবী আম্বর মুরে বলেন, ‘শিশুটির ধমনী প্যাঁচানো এবং দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন বলে চিকিৎসকরা জানানোর পর পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত নেয়।’ মুরে বলেন, ‘ইরানে অস্ত্রোপচার করলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ২০-৩০ ভাগ আর যুক্তরাষ্ট্রে  সফলতার সুযোগ ৯৭ ভাগ।’

মুরে জানিয়েছিলেন, ফাতেমাকে নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত করতে এবং তাকে ভিসা দিতে তিনি এবং আরেক আইনজীবী মিলে আদালতে আবেদন জানিয়েছিলেন। ফাতেমার অস্ত্রোপচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিভিন্ন চিকিৎসকের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন তারা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে মানবিক প্যারোল বিশেষ ভিসা পাওয়ার জন্য একটি শর্ত পূরণ করতে হয়। চিকিৎসার দিন তারিখ ঠিক করে নিতে হয় এবং তহবিল আগাম জমা দিতে হয়। ফাতেমার চিকিৎসার জন্য ওই আইনজীবীরা অর্থ সংগ্রহের ক্যাম্পেইন শুরু করেন। ওরিগনের সিনেটর জেফ মের্কলি এবং রন ওয়াইডেনও ওই আইনজীবীদের সহায়তা করেন। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির পর ফাতেমাকে নিয়ে তার পরিবার তেহরানে ফিরে যায় বলে জানান আইনজীবী মুরে।

ইরানি শিশু

বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। ফাতেমাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভেও আলোচনা হয়। রিপ্রেজেন্টিটিভ সুজানে বোনামিসি হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভে বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং ট্রাম্পের আদেশের নিন্দা জানান। ফাতেমার ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন,  ‘এ হলো ফাতেমা। সে কোনও সন্ত্রাসী নয়। চার মাসবয়সী এই  শিশুটির ওপেন হার্ট সার্জারি প্রয়োজন। তার মা-বাবা মরিয়া হয়ে আছেন, যেন মেয়েকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়া যায়। সে কারণে তারা তাদের দেশ ইরান থেকে ওকে এখানে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন।’

এরপর শুক্রবার আসে সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ। নিষেধাজ্ঞাবিহীন মানবিক পৃথিবী উদ্ভাসিত হয় যেন, চার মাসের এক সদ্যোজাতের চিকিৎসার জন্য। ওইদিন এক বিবৃতিতে কুমো বলেন, ‘এ সন্ধ্যায় আমরা আনন্দিত বোধ করছি যে, ফেডারেল সরকার ফাতেমা রেশাদ ও তার পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের কাগজপত্র দিয়েছে।’ তিনি আরও জানান, নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞদের একটি দল ফাতেমা রেশাদকে চিকিৎসা সহায়তা দিতে রাজি হয়েছে। আর একটি আইনি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফাতেমা ও তার পরিবারের ভ্রমণ খরচ যোগানো হচ্ছে।

সবশেষ আশা জাগানোর মতো খবর দিয়েছেন পোর্টল্যান্ডের শিশু হাসপাতালের ডাক্তাররা। তারা আশাবাদী, সফল অস্ত্রপচারের মধ্য দিয়ে সুস্থ হয়ে উঠবে ফাতেমা।