জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর সারাদেশ

রমিকে যাত্রাবাড়ীতে গ্রেফতার করে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় চার মাস আগে !

মাহবুবুর রহমান রমি

হটনিউজ ডেস্ক:  রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর একটি বাসা থেকে জেএমবির ‘জঙ্গি’ সন্দেহে গ্রেফতার করা বগুড়ার কলেজ ছাত্র মাহবুবুর রহমান রমিকে চার মাস আগেই ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। বগুড়ার গাবতলীর গোড়দহ দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা। রমির মা মাজেদা বেগম জানান, থানা-পুলিশ, র‌্যাব, জেলখানাসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও তারা ছেলের সন্ধান পাননি। পরিবারের সদস্য, গ্রামবাসী ও জনপ্রতিনিধি কেউ বিশ্বাস করেন না তিনি জঙ্গি। তাদের বিশ্বাস, কেউ শত্রুতা করে বা প্রশাসন কৃতিত্ব দেখাতে তাকে জঙ্গি সাজিয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বগুড়ার গাবতলীর গোড়দহ দক্ষিণপাড়া গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাবতলী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার মৃত রায়হানুল হক সরকার রঞ্জুর দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলের মধ্যে রমি দ্বিতীয়। বড় ছেলে রনি সরকার ঢাকায় দিনমজুরি করেন। রমি স্থানীয় গোড়দহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর গাবতলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে গত ২০১০ সালে এসএসসি পাশ করেন। ২০১২ সালে গাবতলী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। এরপর সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজে অনার্সে (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) ভর্তি হন। পড়াশোনার ফাঁকে কৃষিকাজ ও বৃদ্ধা দুই মায়ের সেবা করতেন। এছাড়া বগুড়া শহরের সপ্তপদী মার্কেটে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের শাখা কার্যালয়ে কিছুদিন চাকরি করেন।

মা মাজেদা বেগম জানান, তার ছোট ছেলে সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়তো। গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর তার পরীক্ষা ছিল। পরবর্তী পরীক্ষা ছিল ২৪ সেপ্টেম্বর। ২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাড়িতে পড়ার সময় সাদা পোশাকের একদল মানুষ ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বাড়ি ঘেরাও করে। এরপর তার ছেলেকে গাড়িতে করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তিনি ছেলের সন্ধান পেতে থানা, পুলিশ, জেলখানা ও র‌্যাব অফিসসহ বিভিন্ন দফতরে ধরণা দেন। কিন্তু কেউ তার ছেলের সন্ধান দিতে পারেননি।

সাজেদা বেগম বরেন, ‘গাবতলী থানায় ডায়েরি করতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। তাকে ধরে নিয়ে যাবার ছয় মাস আগেই সে কুরিয়ার সার্ভিসের চাকরি ছেড়ে দেয়। আমার ছেলে কখনও জঙ্গি হতে পারে না। রমি কোনও রাজনীতির সাথেও জড়িত ছিল না। কেউ শত্রুতা করে আমার ছেলেকে জঙ্গি সাজিয়েছে। ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলেও কেউ আমার ছেলের সন্ধান দেয়নি।’ তিনি তার ছেলেকে জঙ্গির অপবাদ থেকে বাঁচাতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

গাবতলী পৌর কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাবেক জাপা নেতা আবদুল হাই সরকার জানান, ‘গোড়দহ দক্ষিণপাড়া গ্রামে ১০ জন ভালো ছেলে থাকলে তার মধ্যে রমি এক নম্বর। সে কখনও জঙ্গি হতে পারে না। ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। গত বুধবার টেলিভিশনের খবরে যাত্রাবাড়ীর জঙ্গি আস্তানা থেকে মাহবুবুর রহমান রমিসহ কয়েকজনের গ্রেফতারের খবরে শুধু আমি নই, পুরো গ্রামের মানুষ হতবাক হয়েছেন।’ গাবতলী পৌরসভার ১ নম্বর প্যানেল মেয়র এটিএম মতিউর রহমানও একই মন্তব্য করেছেন।

গাবতলী থানার ওসি শাহিদ মাহমুদ খান জানান, কেউ কলেজ ছাত্র রমিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাকে অবহিত করেননি। থানায় তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ বা মামলা নেই।

বগুড়া ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর আমিরুল ইসলাম জানান, তাদের তালিকায় মাহবুবুর রহমান রমি নামে কোন জঙ্গি নেই। এছাড়া তারা এ নামে কাউকে গ্রেফতারও করেননি।

উল্লেখ্য, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার (১ ফেব্রুয়ারি) ভোর চারটার দিকে র‌্যাব-১০-এর আভিযানিক দল যাত্রাবাড়ীর দনিয়ার একটি ভবন থেকে মোহাম্মদ আশফাক-ই-আজম ওরফে আপেল ওরফে আব্দুল্লাহ (২৬), মাহবুবুর রহমান ওরফে রমি (২৩), শাহিনুজ্জামান ওরফে শাওন (৩০) ও আশরাফ আলীকে (২৪) গ্রেফতার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে দু’টি বিদেশি পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন, ২১ রাউন্ড গুলি, সাতটি ছুরি, পৌনে তিন কেজি বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক পাউডার, পাঁচটি পাওয়ার জেল, সাতটি মোবাইল, তিনটি ইলেক্ট্রিক ডেটোনেটর, দু’টি সার্কিট ব্রেকার, ছয় প্যাকেট বিয়ারিং বল, ১ কোয়েল ইলেক্ট্রিক তার ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃত রমি ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করে। ২০১৫ সালে বগুড়ার একটি কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করা অবস্থায় আশফাকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। আশফাক তাকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে। রমির দায়িত্ব ছিল বগুড়া অঞ্চলে জেএমবি’র গোপন পার্সেলগুলো সঠিক হাতে পৌঁছানো। জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার পর চাকরি ছেড়ে রমি চট্টগ্রামে গিয়ে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণও নিয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।