জাতীয় ঢাকা রাজনীতি

সাকা চিৎকার করে বলেছিলেন, এই লোকটা ডেঞ্জারাস, একে মেরে ফেল

saka-chowdhury20130730055925স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,হটনিউজটোয়েন্টিফোরবিডি.কম,ঢাকা: রাউজান পৌরসভার শহীদ সতীশ চন্দ্র পালিতকে হত্যার আগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘এই লোকটা ডেঞ্জারাস, একে মেরে ফেল’।

মঙ্গলবার একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো যুক্তি উপস্থাপনকালে এ তথ্য জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন।

প্রসিকিউশনের যুক্তি উপস্থাপনের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া তিনদিনের মধ্যে তা শেষ না হওয়ায় বুধবারের মধ্যে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল

মঙ্গলবার পর্যন্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৩টি অভিযোগের মধ্যে মোট ১৪টিতে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে।

তৃতীয় দিনে ষষ্ঠ অভিযোগের অসমাপ্ত যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন প্রসিকিউটর সুলমান মাহমুদ সীমন। এরপর ১৪তম অভিযোগ পর্যন্ত যুক্তি উপস্থাপন করেন তিনি।

এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, রাউজান পৌরসভার সতীশ চন্দ্র পালিতের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীসহ গিয়ে তাকে হত্যা ও বাড়ি পোড়ানো, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দিয়ে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে অপহরেণ করে তাদের হত্যা করা, বোয়ালখালী সিও অফিসে রাজাকারদের ক্যাম্পে উপস্থিত থেকে কদুরখালির বণিকপাড়া ও হিন্দুপাড়ায় লুটপাট চালানোর ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া এবং মুন্সীরহাটের শান্তি দেবকে বণিকপাড়ায় নিয়ে হত্যা, রাউজান থানার ডাবুয়া গ্রামে সেনাবাহিনীর জিপ নিয়ে গিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান সাধন ধরের বাড়িতে লুটপাট চালানো এবং অগ্নিসংযোগ করার ঘটনা।

সাত নম্বর অভিযোগ অনুযায়ী যুক্তি উপস্থাপনকালে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন বলেন বলেন, সতীশ চন্দ্র পালিতকে হত্যার সময় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে অভিযুক্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও সেদিন উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের ২৮তম সাক্ষী শহীদ সতীশ চন্দ্র পালিতের ছেলে পরিতোষ চন্দ্র পালিত তার স্বচক্ষে দেখা ঘটনা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য ও জেরায় বর্ণনা করেছেন।

এ সময় প্রসিকিউটর সাক্ষ্য ও জেরার বিভিন্ন অংশ উদ্ধৃত করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অপরাধ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল সতীশ চন্দ্রকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রথমে গুলি করে হত্যা করে। পরে ঘর থেকে লেপ, কাঁথা এনে মৃতদেহ মুড়িয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

সীমন বলেন, সাক্ষীর সাক্ষ্য অনুসারে সতীশ চন্দ্র পালিতকে হত্যার আগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘এই লোকটা ডেঞ্জেরাস, একে মেরে ফেল’।

এতে প্রমাণিত হয়, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নির্দেশ দেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখতেন। তাছাড়া গুলি করে হত্যার পর আবার লাশ পোড়ানো নৃশংসতাকেও হার মানায়।

আট নম্বর অভিযোগ অনুযায়ী যুক্তি উপস্থাপনকালে প্রসিকিউটর বলেন, চট্টগ্রামকে নেতৃত্বশূন্য করতেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজাফফর আহমেদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।

কারণ, শেখ মুজাফফর আহমেদ চট্টগ্রামের রাউজান থেকে অভিযুক্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

এ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী, শেখ আলমগীরের স্ত্রী উম্মে হাবীবা তার সাক্ষ্যে এ বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন, চট্টগ্রামকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্যই আমার স্বামী এবং শ্বশুরকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাক্ষী তার সাক্ষ্য ও জেরায় আরো উল্লেখ করেছেন যে, তার স্বামী এবং শ্বশুরকে ছাড়িয়ে আনতে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেছিলেন, এ নিয়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তিনি কথা বলবেন।

প্রসিকিউটর যুক্তি দেখান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ দু’জনকে অপহরণ করার সময় কেবল সঙ্গেই ছিলেন না, তিনি তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও ছিলেন মূল ব্যক্তি।

১১তম অভিযোগ অনুযায়ী, সালাউদ্দিন কাদের ও তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর নির্দেশে স্থানীয় রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বোয়ালখালী থানার হিন্দু অধ্যুষিত শাকপুরা গ্রামে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। এ ঘটনায় শহীদদের মধ্যে ৭৬ জনকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়।

১২তম অভিযোগ অনুযায়ী, রাউজানের জগৎমল্লপাড়ায় সালাউদ্দিন কাদেরের উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিজয় কৃষ্ণ চৌধুরী রাখাল, বিভূতি ভূষণ চৌধুরী ও হরেন্দ্র লাল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করে।

এছাড়া ঘাসি মাঝিপাড়ায় আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাড়িতে লুটপাট চালানো, ছয়জনকে হত্যা ও দুইজনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় সালাউদ্দিন কাদের, তার বাবা ফজলুল কাদের এবং তাদের সহযোগী রাজাকার অলি আহমেদের জড়িত থাকার কথা বলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন।

এছাড়া পারেরহাটের কর্তাদিঘির পাড় থেকে আরেক আওয়ামী লীগ সমর্থক মো. হানিফকে ধরে গুডস হিলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় সালাউদ্দিন কাদের জড়িত ছিলেন। মো. হানিফকে পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি।

রোববার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়। ওই দিন প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগের সম্পূর্ণ ও তৃতীয় অভিযোগের আংশিক যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়। সোমবার সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে তৃতীয় অভিযোগের অসমাপ্ত এবং চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগের যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউশন।

রাষ্ট্রপক্ষের শেষ হলে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া। এরপরে রায় ঘোষণার দিন ধার্য করবেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ২৪ জুলাই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। সালাউদ্দিন কাদেরের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি নিজেসহ মোট চারজন। অন্য তিন সাফাই সাক্ষী হলেন তার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু নিজাম আহমেদ, এশিয়া-প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাইয়ুম রেজা চৌধুরী এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোমেন চৌধুরী।

এর আগে সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশনের মোট ৪১ জন সাক্ষী। আর চারজন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রত্যুষে গ্রেফতার করা হয় গাড়ি ভাংচুর ও পোড়ানোর মামলায় সাকা চৌধুরীকে। পরে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে। গত বছরের ৪ এপ্রিল সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এতে তার বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের উল্লেখ করা হয়।