অর্থ ও বাণিজ্য ঢাকা

২ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির কৌশল

Ra-5020130730022840হটনিউজ২৪বিডি.কম,নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা, ৩০ জুলাই : ঈদ বাজারে ক্রেতাদের কাছ থেকে ভ্যাটের টাকা নেয়া হলেও তা যাচ্ছে না সরকারের কোষাগারে।
এই রমজান ও ঈদের কেনাকাটায় অন্তত্ব ২ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির কারসাজি শুরু হয়েছে।
অভিজাত শপিংমল থেকে শুরু করে ফ্যাশন হাউজ এনমকি সুপার শপগুলো নিত্যপণ্য বিক্রি করে তার উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে নিচ্ছে।
অথচ চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল এবং শাক-সবজির মতো ভোগ্যপণ্য কেনাবেচায় ভ্যাট কাটার নিয়ম নেই। তারপরও ভ্যাট কেটে নেয়া হচ্ছে। তবে বিভিন্ন কৌশলে ফাঁকি দেয়ার কারণে এই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না।
ভ্যাট আদায়ে ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার বা ইসিআর চালু করা হলেও সুকৌশলে এই মেশিন টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। এছাড়া রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশেও ফাঁকির মহোৎসব চলছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র মতে, রমজান মাস ও ঈদুল ফিতরে বিভিন্ন বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস, শপিংমল, মেগাশপ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, বিভিন্ন ফাস্ট ফুড, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান ও চেইনশপে বিপুল অঙ্কের বেচাকেনা হলেও এসব জায়গা থেকে কাঙ্খিত ভ্যাট আদায় না হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কারণ অধিকাংশ ফ্যাশন হাউস, শপিংমল, চেইনশপ ও ফাস্ট ফুডের দোকানগুলোতে বেচাকেনার পর কোন চালান বা রশিদ দেয়া হচ্ছে না। কিংবা তা দেয়া হলেও ভুয়া।
জানা গেছে, এককভাবে এনবিআর ভ্যাট থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করে থাকে। মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১ হিবেবে মহান জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পর থেকে ভ্যাট থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়ে আসছে।
প্রতিবছর বাড়ছে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ। সেই সঙ্গে এর আওতা ও পরিধি বেড়েছে। কিন্তু সরকার কাঙ্খিতহারে ভ্যাট পাচ্ছে না।
চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও সরকার ভ্যাট থেকে এককভাবে সবচেয়ে বড় অংশ আদায় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আর এই ঈদ থেকে ভ্যাটের একটি বড় অংশ আদায় করা হয়। কিন্তু যেভাবে ফাঁকির প্রবণতা বাড়ছে তাতে ভ্যাট আদায়ে এনবিআর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে এনবিআরের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে রাজস্ব বোর্ড বরাবর আন্তরিক। কিন্তু তারপরও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন কারসাজির কারণে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া এনবিআরের যেসব কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন তাদেরও সমস্যা রয়েছে। ফলে ভোক্তাদের কাছ থেকে ভ্যাট কাটা হলেও ফাঁকি বন্ধ হচ্ছে না।
অথচ বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পূরণ করতে হলে ফাঁকি বন্ধ করতে হবে।
এদিকে, এত ফাঁকির পরও ভ্যাট খাতে প্রতিবছরই রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও। পরোক্ষ এই কর বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই সময়েও বেশি অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে। কিন্তু এ খাতে শৃঙ্খলা না থাকায় ক্রেতাদের পকেট কাটা যাচ্ছে ঠিকই, তবে তা ঠিকমত সরকারের তহবিলে জমা হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ সহায়তায় সম্প্রতি ভ্যাট আইন সংসদে পাশ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো এত বেশি হারে কোথাও ভ্যাট আদায় করা হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জেনারেল সেলস ট্যাক্স বা জিএসটি নামেও খুচরা বিক্রির ওপর কর নিয়ে থাকে। তবে তা ৩-৫ শতাংশের বেশি নয়। কিন্তু বাংলাদেশে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে গিয়ে অন্যান্য করের সঙ্গে মিলিয়ে পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে সুপারশপ ও মেগাশপগুলো অতিপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে নিচ্ছে। অথচ ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা এবং ডালের মতো পণ্য আমদানিতেও শুল্ক নেয়া হয় না।
সূত্র মতে, বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে সেবা ও পণ্য ক্রয় করলে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কাটা হচ্ছে। এই ঈদে ব্যবসায়ীদের ভ্যাট কাটার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। অনেক ব্যবসায়ী নতুন ইসিআর মেশিন বসিয়েছেন। কিন্তু ওই মেশিনে ভ্যাট কাটা হলেও সরকারি কোষাগারে তা জমা হচ্ছে না। কারণ প্রতিটি ইসিআর মেশিনে ফাঁকি দেয়ার প্রযুক্তি রয়েছে। এছাড়া কোন কোন পণ্য ও সেবার বিপরীতে ভ্যাট মওকুফ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
পণ্য বিক্রির পর রশিদ দেয়া হলেও তার ভ্যাট চালান নম্বরবিহীন। এ নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডাও হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ঈদ সামনে রেখে নিত্যপ্রযোজনীয় পণ্যসহ সব ধরনের কেনাকাটায় ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে ক্রেতারাও রীতিমতো বিরক্ত।
এদিকে, ভ্যাট ফাঁকি রোধে এনবিআর ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এগুলো হচ্ছে-অডিট রিপোর্টে সন্দেহ ও গরমিল পাওয়া গেলেই হবে মামলা, শাস্তি হিসেবে থাকছে কারাদণ্ড বা জড়িমানা। অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন ভ্যাট ফাঁকিবাজ। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার ‘ইসিআর’ ও পয়েন্ট অব সেলস ‘পস’ পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য মনোনীত হয়েছে কিন্তু ব্যবহার করছে না সেক্ষেত্রে অনিয়ম মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনবিআর।
এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান ইসিআর মেশিনে ফাঁকি দেয়ার প্রযুক্তি স্থাপন করেছে তা চিহ্নিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানা গেছে, সরকারি আয়ের বিপুল অঙ্কের এই ভ্যাট আদায় হয় পণ্য ও সেবা খাত থেকে। পণ্য খাতে সবচেয়ে বেশি ভ্যাট আদায় হয়ে থাকে সিগারেট ও বিড়ি শিল্প থেকে। অপর দিকে সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি ভ্যাট আদায় হচ্ছে ব্যাংকিং খাত, নির্মাণ সংস্থা ও সরকারি কাজে বিভিন্ন ক্রয় ও সরবরাহ থেকে।
এদিকে খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট ফাঁকি রোধে গত ২০০৮ সালে এসআরও জারির মাধ্যমে ইসিআর পদ্ধতি চালু করা হয়। ওই সময় ১০ ক্যাটাগরিতে ভ্যাট আদায়ের জন্য ইসিআর ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হয়। আবাসিক হোটেল, খাবার রেস্তোরাঁ, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, আসবাবপত্র বিপণন কেন্দ্র, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, মেট্রোপলিটন এলাকার অভিজাত শপিংমল, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, জেনারেল স্টোর ও অন্যান্য বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান (পাইকারি ও খুচরা)।
তবে সর্বশেষ স্বর্ণ ও রোপ্য দোকানদার ব্যবসায়ীদের ও ভ্যাট আদায়ে ইসিআর মেশিন ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।