লাইফ স্টাইল সিলেট

চা বাগানের সেই রাজু এখন……

rajur maaএম শাহজাহান আহমদ,মৌলভীবাজার:নয়নাভিরাম চা বাগানের নিস্তব্ধ-নির্জন সবুজ দুনিয়ায় বেড়ে ওঠা তার। খুব ছোটবেলা থেকে মূলত বাবার প্রশ্রয়েই ক্রিকেটের সঙ্গে তার সখ্য। বাবা মোঃ আব্দুল খালেক জালাল মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত কুলাউড়ার গাজীপুরস্থ ইস্পাহানি-মির্জাপুর চা বাগানের প্রধান করণিক ছিলেন। স্ত্রী, ২ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে আর্থিক টানাপড়েনের সংসার। তার পরও তার বড্ড ভালবাসা আর দরদ ছিল ক্রিকেটের প্রতি। দুই ছেলেকে নিয়ে দেখা স্বপ্নটাও তাই ক্রিকেট ঘিরেই। ওরা ক্রিকেটার হবে, দেশের হয়ে বিশ্ব মাতাবে। এমন সরল-সহজ বিশ্বাস আর আবেগ-আহ্লাদে দুই ছেলেকে নিয়ে যেতেন খেলার মাঠে। নিজে দর্শক হয়ে তাদের খেলা খুব মজা করে উপভোগ করতেন। অসচ্ছল এই পিতার জন্য ছেলেদের ক্রিকেট উপকরণ কিনে দেয়া দুরূহ হলেও কখনোই বড় ছেলে আবুল কাশেম রুবেল ও ছোট ছেলে আবুল হাসান রাজুকে তা বুঝতে দিতেন না। মাঠ ও মাঠের বাইরে পড়ালেখার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা নিয়ে তাদের অনুপ্রেরণা জোগাতেন। এতদঞ্চলে তিনিই একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি সন্তানদের উৎসাহ দেয়ার জন্য মাঠে ছুটে যেতেন। দুই ছেলের খেলা থাকলেতো কথাই নেই। এ নিয়ে সহকর্মী ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সমালোচনা ও ঠাট্টা-বিদ্রুপও তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তার দুই ছেলের বন্ধুবান্ধব, খেলোয়াড়সহ পুরো উপজেলার ক্রিকেটারদের কাছে ‘ক্রিকেট আঙ্কেল’ হিসেবেই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন। এমন উপাধিতে তিনি যথেষ্ট সম্মানবোধও করতেন। লালনকৃত স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাসে তিনি সহকর্মী আর বন্ধুবান্ধবের কাছে দুই ছেলেকে নিয়ে প্রত্যাশার গল্প শোনাতেন। তোরা দেখবি ওরা দেশসেরা ক্রিকেটার হবে। এমন দৃঢ় স্বপ্ন-প্রত্যাশায় প্রত্যয়ী, ক্রিকেটপ্রেমী এতদঞ্চলের ক্রীড়ামোদীদের প্রিয় মানুষটি দেখে যেতে পারেননি তার রাজু বিশ্বের ক্রিকেটাঙ্গনকে অবাক করে দিয়েছে। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঃ কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের গাজীপুর চা বাগানের স্টাফ কোয়ার্টারে ১৯৯২ সালের ৫ আগস্ট জন্ম আবুল হাসান রাজুর। বাড়ির পাশে মক্তব আর গাজীপুর চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনায় হাতেখড়ি। এরপর আলাউদ্দিন রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নবীণ চন্দ্র আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ক্রিকেটে হাতেখড়ি ঃ বড় ভাই রুবেলের ব্যাট-বল আর বাবার উৎসাহে রাজুর ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচয়। এরপর ক্রমান্বয়ে বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে বাগানের খেলার মাঠ এবং তারপর গাজীপুর ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে শুরু হয় ছুটে চলা পাড়া থেকে পাড়ায়, উপজেলা থেকে জেলায়। কুলাউড়ার ক্রিকেটারদের বৃহৎ সংগঠন ক্রিকেট প্লেয়ার্স এসোসিয়েশনের (সিপিএ) সদস্য পদ লাভের পর ফিরে তাকাতে হয়নি আর পেছনে। জেলা থেকে বিভাগে প্রায় খেলাতেই ম্যান অব দ্য ম্যাচ হতেন অনবদ্য অলরাউন্ড পারফরমেন্সের কারণে। অনূর্ধ্ব ১৩, ১৬ ও ১৯ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ম্যাচে দেখিয়েছিলেন প্রতিভার ঝলক। এরপর জাতীয় দলের হয়ে ওয়ানডে, টি-২০’র পর এবার অভিষেক হলো ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত পরিসর টেস্ট ম্যাচে। প্রথম ম্যাচে ১০ নম্বরে নেমে ব্যাটিংয়ের যে প্রদর্শনী দেখালেন তাতে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক প-িতরাও মজেছেন আবুল হাসান রাজুর ক্যারিশমায়। ১১০ বছর ধরে থাকা এক কীর্তি নিজের দখলে নিয়ে বিশ্ব মাতালেন। রাজুদের পরিবার ঃ বাবা মোঃ আবদুল খালেক জালাল মারা যান ২০০৮ সালের ৬ই ডিসেম্বর। মা মোছাম্মৎ কামরুন নাহার একজন আদর্শ গৃহিণী। বড় ভাই আবুল কাশেম রুবেলের স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার কিন্তু বাস্তবে হয়েছেন গাজীপুর চা বাগানের টিলা তত্ত্বাবধায়ক। বড়বোন ফাতেমা জান্নাত হ্যাপী অগ্রণী ব্যাংক সিলেট বন্দরবাজার শাখায় কর্মরত। ৩ ভাই-বোনের মধ্যে রাজু সবার ছোট। কথা রাখলেন রাজু ঃ জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর রাজু বাড়িতে এলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুভাষ দাস শুভকে বলেছিলেন, তোকে বলে রাখলাম দেখিস একবার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেলে সবাইকে অবাক করে দেবো। তার এমন দৃঢ় মনোবলের কথা জানালেন বন্ধু সুভাষ। তিনি আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে বললেন, বন্ধু আমার কথা রেখেছে। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে দেশের সম্মান বাড়িয়েছে। চটপটে রাজুর দুরন্তপনা ঃ ওর সব চিন্তা-চেতনা ক্রিকেটকে ঘিরে, দিনরাত ব্যস্ত- মহাব্যস্ত। ক্রিকেটার সৃষ্টি, মাঠ, পিচ, বল, ব্যাট এমন সব ক্রিকেট উপকরণ ওর মাথায় সব সময় গিজগিজ করতো। মা, বোন ও ভাইয়ের বকুনি ওকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এ মাঠ থেকে ও মাঠে বল আর ব্যাট হাতে খেলার মাঠে সহযোগী খেলোয়াড়দের নিয়ে নাওয়া-খাওয়ার বালাই থাকতো না। এমনটি জানালেন তার মা ও বাবার সহকর্মী মিছবাহ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। বোন হ্যাপী জানান, রাজুর সপ্তম শ্রেণীর অঙ্ক পরীক্ষার আগের রাতে তার খাতা পরীক্ষা করতে গিয়ে আবিষ্কৃত হয় জাতীয় দলের সব খেলোয়াড়ের নাম আর সবার আগে জাতীয় দলের তৎকালীন অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের নাম কেটে লেখা তার নিজের নাম। বোনের কথা শেষ হতেই মা কামরুন্নাহার যোগ করলেন, আমি যখনই নামাজে বসতাম, তখনই রাজু কাছে এসে বলতো মা আমার জন্য দোয়া করো আমি যেন ক্রিকেটার হতে পারি। আর তা হতে না পারলে আমি যেন মরে যাই। রাজুর এই প্রার্থনা শুধু আমার কাছেই নয় বরং কোন আত্মীয় এলে তাদের কাছেও সে এই দোয়া চাইত। ব্যতিক্রমী ক্রিকেট আয়োজক ঃ ক্রিকেট কেন্দ্রিক ওর চিন্তা বাস্তবায়নে নিজ গ্রামের সহপাঠী, বন্ধু ও ক্লাবের খেলোয়াড়দের সহযোগিতায় ক্রিকেটের প্রতি স্থানীয়দের অনুপ্রাণিত করতে চেষ্টা করতো রাজু। এজন্য আয়োজন করেন বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম বয়স্ক চা শ্রমিকদের নিয়ে ফ্লাডলাইটের আলোতে ক্রিকেট খেলা। এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন কুলাউড়া উপজেলাসহ পুরো জেলার ক্রীড়ামোদীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। তার নিজ হাতে তৈরি বাড়ির পাশে দুটি খেলার মাঠের পিচ কয়েকটি গ্রামের কিশোর-তরুণদের প্রতিনিয়তই ক্রিকেট খেলায় অনুপ্রাণিত করে। কৃতজ্ঞচিত্তে এমনটি জানালেন মাঠে খেলায় থাকা জুয়েল, শাওন, তানভীর, তপন, রুমন, সবুজ, পারভেজ, হাসান, ইয়াসিন, গুলসু পাসি, রায়হান, শফিক ও তার নিজ ক্লাবের মোস্তফা মাহমুদ, সাইফুল ইসলাম কাদির, বিপ্লব সরকার, নাদিম মাহমুদ রাজু, সুয়েল আহমদ, রাজীবসহ অনেকেই। রাজুর পছন্দ ও অপছন্দ ঃ নাম নিলে পুরো নাম আবুল হাসান রাজুই বলতে হবে। আর সংক্ষিপ্ত হলে শুধু রাজু। নামের বেলায় এটিই তার প্রত্যাশা। আর খাবারের বেলায় গরুর মাংস ভুনা, টক, ইলিশ মাছ, শুঁটকি ভর্তা আর পিছিয়ে থাকা চা শ্রমিকদের সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া। এ ছাড়া অবসরে রাজু পছন্দ করে সুরেলা কণ্ঠে গান ও গজল গাইতে। সংগঠকদের প্রত্যাশা ও অভিনন্দন ঃ রাজুর প্রতিভার প্রতি সমীহ ছিল সব ক্রিকেট সংগঠক ও ক্রিকেট অনুরাগীদের। তার এমন বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্বের প্রত্যাশা ছিল তাদের। ক্রিকেটাঙ্গনে প্রবেশের পর থেকে এমন প্রতিভার আভাস ছিল তার মাঝে। এমনটি জানালেন কুলাউড়া ক্রিকেট প্লেয়ার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি প্রভাষক সিপার উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক কয়ছর রশীদ। এ ছাড়া রাজুর কৃতিত্বে অভিনন্দন জানিয়েছেন কুলাউড়ার আলী আব্বাস খাঁন এমপি, সাবেক সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ, এম এম শাহীন, বিএনপি নেতা এডভোকেট আবেদ রাজাসহ নির্বাচিত সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ। বাড়িতে ক্রীড়ামোদীদের ঢল ঃ রাজুর পরিবারের সদস্যদের অভিনন্দন জানাতে পুরো জেলার সর্বস্তরের খেলোয়াড়, ক্রীড়াসংগঠক, বিভিন্ন ক্লাব, মিডিয়াকর্মী ও রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ক্রিকেট অনুরাগীরা মিষ্টি ও ফুল নিয়ে অভিনন্দন জানাতে ভিড় করছেন রাজুর গ্রামের বাড়িতে। তার পরিবারের পক্ষ থেকেও দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা ও দোয়া চেয়েছেন রাজুর পরিবার।