জাতীয় রাজশাহী

তিন বছরেও শুরু হয়নি ৩ পুলিশ হত্যার বিচার

Pabna-3-Police-sm20130719163440ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট,হটনিউজটোয়েন্টিফোর.কম,পাবনা: পাবনার বেড়া উপজেলার প্রত্যন্ত ঢালারচরে চরমপন্থিদের ব্রাশফায়ারে তিন পুলিশ হত্যার তিন বছর পূর্ণ হচ্ছে শনিবার। কিন্তু গত তিন বছরেও শুরু হয়নি চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম।

কিছু আইনি জটিলতার কারণে এ মামলার বিচার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে বলে দাবি করে পুলিশ জানায়, বর্তমানে মামলাটি পাবনা জজ আদালতে বিচারের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে কবে নাগাদ বিচারকাজ শুরু হতে পারে সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি তারা।

বেড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন হটনিউজকে জানান, চরমপন্থিদের হাতে নিহত হবার ঘটনায় বেড়া ও রাজবাড়ী থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন সময়ে মামলার অধিকাংশ আসামিকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্ত কাজ শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। তবে এখনও বিচার কাজ শুরু হয়নি।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ২০ জুলাই সন্ধ্যায় নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে বেড়া উপজেলার প্রত্যন্ত ঢালারচর দাসপাড়া নামক স্থানে আমিনপুর পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) কফিল উদ্দিন (৫০), নায়েক আব্দুল ওয়াহেদ (৩৫) ও কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম (৩৫) নিহত হন।

নিহতদের মধ্যে কফিল উদ্দিনের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার ফকিরহাট গ্রামে। নায়েক আব্দুল ওয়াহেদের বাড়ি বগুড়া জেলার সাড়িয়াকান্দি উপজেলার গনকপাড়া গ্রামে এবং কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার কোনাবাড়ি গ্রামে।

এ ঘটনার পরদিন ২১ জুলাই আমিনপুর পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল রশিদুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে বেড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

প্রথমদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন এসআই আবুল কালাম আজাদ। পরবর্তীতে বদলিজনিত কারণে মামলার তদন্ত কাজ শেষ করেন আমিনপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জহির উদ্দিন।

মামলার পর ৩ পুলিশ কিলিং মিশনের সঙ্গে জড়িত এ সন্দেহে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি বিভিন্ন গ্রুপের শীর্ষ ২০ জনের তালিকা নিয়ে সাঁড়াশি অভিযানে নামেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

মামলায় বেড়া ও রাজবাড়ী সদর থানা পুলিশ বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে বেড়া, রাজবাড়ী ও সাভার এলাকা থেকে ২০ জনের মধ্যে মোট ১১ জন চরমপন্থি সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। অভিযানে উদ্ধার করা হয় হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত চরমপন্থিদের বেশকিছু আগ্নেয়াস্ত্র।

এছাড়া পুলিশের তালিকাভূক্ত শীর্ষ ২০ সন্ত্রাসীর মধ্যে দুই চরমপন্থি নেতা মোস্তাক আহমেদ মিলন ও চালাক রফিক নিজেদের দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে খুন হন।

মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ এক বছর তিন মাস তদন্ত কাজ শেষে ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে পাবনা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জহির উদ্দিন।

অভিযোগপত্রে মোট ৫৪ জনকে সাক্ষী দেখানো হয়। মামলার আসামিদের মধ্যে গ্রেফতারকৃত ১১ জন কারাগারে, ৫ জন পলাতক ও ২ জন মারা গেছেন।

গ্রেফতারকৃত ১১ জন হলেন পাবনা সদর উপজেলার খাসচর বলরামপুর গ্রামের নিস্তার ওরফে জাহিদ ওরফে নিজাম, বেড়া উপজেলার মিরপুর গ্রামের নুরু মণ্ডল, একই উপজেলার রাজধরদিয়া গ্রামের নিজাম ফকির ওরফে ছোট নিজাম, পশ্চিম কাছাদিয়া গ্রামের আইয়ুব আলী, শুকুর আলী ও আক্কাস আলী, ধারাই গ্রামের রফিক ওরফে জইট্যা রফিক, সুজানগর উপজেলার পুকুরনিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম, একই উপজেলার হাসামপুর গ্রামের নাদের প্রামানিক, রাজবাড়ী সদর উপজেলার মাইছেঘাটা গ্রামের জোসন মোল্লা ওরফে জাবেদ ও একই জেলার পাংশা উপজেলার চর রামনগর গ্রামের ইউনুস মোল্লা।

পলাতক ৫ আসামি হলেন পাবনার বেড়া উপজেলার মিরপুর গ্রামের নিজাম মণ্ডল, একই উপজেলার ঢালারচর গ্রামের জহুরুল ইসলাম, রাজবাড়ী সদর উপজেলার ধুনচি গ্রামের খালেক ওরফে গেদু ওরফে মিজান, গোয়ালন্দ উপজেলার চর দেউলী গ্রামের ইয়ার আলী ওরফে বেল্লাল ও পাংশা উপজেলার চর রামনগর গ্রামের মুক্তার ওরফে আজম ওরফে আমিন।

মারা যাওয়া দু’জন হলেন বেড়া উপজেলার ঢালারচর গ্রামের ওহাব কাজী ও আটঘরিয়া উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের হাশেম ওরফে খোকন ওরফে বাচ্চু।

আমিনপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জহির উদ্দিন হটনিউজকে জানান, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অধিকাংশ আসামি আদালতের কাছে ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়াও তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। গ্রেফতারকৃত ১১ জনকে কারাগারে পাঠানোর পর অনেকেই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

তিন পুলিশকে হত্যার কারণ সম্পর্কে বেড়া থানার ওসি জাহাঙ্গীর হোসেন হটনিউজকে জানান, গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তি অনুয়ায়ী চরমপন্থিদের চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কাজে বাধা দেওয়ার কারণেই মূলত নিরস্ত্র তিন পুলিশকে ঢালারচর এলাকায় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।

যেভাবে খুন হন তিন পুলিশ
প্রত্যক্ষদর্শী কনস্টেবল রশিদুল ও সোর্স গণি সরদারের বরাত দিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জহির উদ্দিন হটনিউজকে জানান, ২০১০ সালের ২০ জুলাই বিকেলে ঢালারচর পুলিশ ফাঁড়ির জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সোর্সের খবরের ভিত্তিতে ঢালারচরের দাসপাড়া এলাকায় জ্বালানি কিনতে যান ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) কফিল উদ্দিন, নায়েক আব্দুল ওয়াহেদ ও কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম। এ সময় তারা নিরস্ত্র ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন কনস্টেবল রশিদুল ইসলাম ও সোর্স আব্দুল গণি সরদার।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় পুলিশ সদস্যরা মহিষের গাড়িতে করে জ্বালানি কিনে ক্যাম্পে ফেরার পথে সোর্স গণি সরদারের বিয়াই আক্কাস সরদারে বাড়িতে জল খাবার খেতে যান। তখন সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা বাজছিল।

সে সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সন্ত্রাসীরা স্থানীয় পঁচার মাঠে ফুটবল খেলছিলেন। তারা এলাকায় পুলিশের উপস্থিতির খবর পেয়ে মনে করেন, পুলিশ তাদের ধরতে এসেছে। এ সময় তাদের মধ্যে চরমপন্থি সর্বহারা নেতা রফিক ওরফে চালাক রফিকের (পরে দলীয় কোন্দলে খুন হন) কাছে থাকা একটি এসএমজি দিয়ে তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে তিন পুলিশ ও গণি সরদারকে ধরে নিয়ে রাস্তার উপর দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করলে ঘটনাস্থলেই তিন পুলিশ সদস্য নিহত হন।

গুলির শব্দে আতঙ্কে ঢোল কলমির (এক ধরণের জঙ্গল) মধ্যে পড়ে যান গণি সরদার। তিনি মারা গেছেন ভেবে চরমপন্থিরা তাকে আর গুলি করেননি। এর আগে বিষয়টি টের পেয়ে কনস্টেবল রশিদুল ও মহিষের গাড়ির চালক মঞ্জু হোসেন কৌশলে বাড়ির ভেতর দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ফলে সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে রক্ষা পান কনস্টেবল রশিদুল, গাড়িচালক মঞ্জু ও সোর্স গণি সরদার।

সেদিন পুলিশ কিলিং মিশনে ছিলেন অন্তত: ১৫-২০ জন চরমপন্থি সন্ত্রাসী। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের লাশ ও পুলিশ হত্যায় ব্যবহৃত ১টি শর্ট মেশিনগান (এসএমজি), ১টি চায়না রাইফেল, রাইফেলের ৫৫ রাউন্ড গুলি, ১টি ম্যাগাজিন, ১১ রাউন্ড গুলির খোঁসা ও একটি নোকিয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করে।

পাবনার পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ হটনিউজকে জানান, কারা ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল তদন্তের মাধ্যমে এবং গ্রেফতারকৃত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মামলার পলাতক কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও জানান, এক সময়ের চরমপন্থি অধ্যুষিত ঢালারচর এলাকায় আগের মতো আর চরমপন্থি সন্ত্রাসীদের ব্যাপকতা নেই। বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি যথেষ্ট ভালো বলেও দাবি করেন তিনি।