কিশোরগঞ্জ

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের মেয়েকে হত্যা করান বাবা !

প্রতিবেশীর সঙ্গে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ ছিল। এর জের ধরে প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে এক বাবা নিজের কন্যাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। বাবার পরিকল্পনা অনুসারে চাচা ও চাচাতো ভাইয়ের হাতে খুন হন আছমা আক্তার মীরা (১৯)। হত্যাকাণ্ডের ২০ দিন পর এর রহস্য উদ্‌ঘাটন করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। প্রতিবেদনে বাবাকেই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে করিমগঞ্জের ভাটিয়া জহিরকোনা গ্রামে।

নিহত আছমা আক্তার মীরা ভাটিয়া কওমি মহিলা মাদ্রাসার হাদিস বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১০ আগস্ট বাড়ির পাশে তাঁকে ছুরিকাঘাত ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ঘটনার পরদিন আছমার বাবা আনোয়ারুল ইসলাম ওরফে আঙ্গুর মিয়া বাদী হয়ে প্রতিবেশী আবু বক্কর সিদ্দিক (৫৪), তাঁর তিন ছেলে হান্নান (৩৫), নয়ন (৩০), সাদ্দামসহ (২২) ১৬ জনকে আসামি করে করিমগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেছিলেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছিল, আসামিদের সঙ্গে আঙ্গুর মিয়ার বাড়ির সীমানা এবং জায়গাজমি নিয়ে বিরোধ আছে। এ কারণে আসামিরা বিভিন্ন সময় হত্যার হুমকি দিতেন। ঘটনার রাতে আঙ্গুর মিয়া বাড়িতে ছিলেন না। মেয়ে আছমা ও তাঁর স্ত্রী একই বাড়িতে আলাদা কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন। পরদিন সকালে বাড়ির পাশে একটি জমি থেকে মীরার গলাকাটা ও বুকে-পিঠে ছুরিকাঘাত করা লাশ পাওয়া যায়।

তবে সূত্রমতে, মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ২৩ আগস্ট এ বিষয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা করিমগঞ্জ থানার এসআই অলক কুমার দত্ত। আছমার বাবা ও চাচা পলাতক আছেন বলে জানা গেছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে চাচাতো ভাইকে।

আদালতে দেওয়া প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, আছমার বাবা আঙ্গুর মিয়ার পরিকল্পনায় তাঁর ভাই খুরশিদ মিয়া ও ভাতিজা সাদেক মিয়া আছমাকে হত্যা করেছেন। এতে বলা হয়, সাদেক মিয়ার মোবাইল ফোনের কথোপকথনে সন্দেহ হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। সাদেক মিয়া জানান, আঙ্গুর মিয়ার প্রস্তাবে ঘটনার রাতে সাদেক ও খুরশিদ মিয়া আছমাকে হত্যা করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ আগে আঙ্গুর মিয়া, সাদেক মিয়া ও খুরশিদ মিয়া জেলা সদরের আজিমউদ্দিন হাইস্কুল মাঠে বসে পরামর্শ করেন। প্রতিপক্ষের সঙ্গে পেরে উঠতে হলে মেয়ে আছমাকে খুন করার প্রস্তাব দেন আঙ্গুর মিয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে সাদেক ও খুরশিদ মিয়া রাজি হলে পরিকল্পনা করা হয়, রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে আঙ্গুর মিয়া মেয়েকে ফোন করে বলবেন সাদেককে ৫০০ টাকা দেওয়ার জন্য। আছমা টাকা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেই তাঁকে খুন করা হবে। পরিকল্পনা অনুসারে, গত ১০ আগস্ট রাত ১১টার দিকে সাদেক ও খুরশিদ মিয়া আছমাদের বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়ের কাছে গেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আছমা ঘর থেকে বের হয়ে এসে সাদেককে ৫০০ টাকা দেন। সে সময় বাড়ির খবরাখবর জিজ্ঞাসা করার একপর্যায়ে সাদেক মিয়া আছমার নাক-মুখ চেপে ধরেন। আর খুরশিদ মিয়া এক হাতে আছমার গলা চেপে ধরে আরেক হাতে বুকে, পিঠে ও পেটে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর খুরশিদ মিয়া ছুরি দিয়ে আছমার গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরে তাঁরা এলাকা ত্যাগ করার সময় একটি পুকুরে ছুরিটি ফেলে দেন।
সাদেকের স্বীকারোক্তি অনুসারে ছুরিটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। চাচা খুরশিদ মিয়া ও আছমার বাবা আঙ্গুর মিয়া পলাতক রয়েছেন। আর চাচাতো ভাই সাদেক মিয়াকে ২৩ আগস্ট আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে, এ ব্যাপারে করিমগঞ্জ থানার ওসি জাকির রব্বানীকে ফোন করলে তিনি তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলা যাবে না বলে জানান।