হটনিউজ স্পেশাল

দরিদ্রতার কাছে হেরে পৃথিবী থেকে বিদয় নিল জয়

Prakash Chandra Duttaরিপন হোসেন, যশোর থেকে:দরিদ্রতার কাছে হেরে গেছে জয়। জীবনের সব হিসাব চুকিয়ে সে পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে। ২ শিশু পুত্র আর বৃদ্ধ মা ও স্ত্রীকে অথৈই সাগড়ে ভাসিয়ে জয় পাড়ি দিয়েছে আজানার দেশে। যেখান থেকে কেউ ফেরে না। অবুঝ শিশুরা পিতৃ হারানোর ব্যথা না বুঝলেও যারা বুঝছেন তাদের কাঁন্না থামানোর ভাষা জানা নেই কারোর। বৃদ্ধ মা আর স্ত্রী মেঘলার বুক ফাঁটা আর্তনাদে এলাকার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। স্বজন হারাদের কাঁন্না দেখে উপস্থিত অন্যরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ঘটনাটি ঘটেছে যশোর শহরের বেজপাড়ায়। গত রাতে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে প্রকাশ দত্ব ওরফে জয় নামের একজন ব্যবসায়ী।যশোর বেজপাড়ার মৃত. রনজিত দত্বের ছেলে প্রকাশ দত্ব জয়। পেশায় ব্যবসায়ী। যশোর সিটি প্লাজা মার্কেটে জয়ের কাপড়ের ব্যবসা। ২/৩ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসা করছেন। এর আগে জয় যশোর স্পন্দন কালার ল্যাবে ল্যাব সহকারী হিসেবে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন। সামান্য বেতনে সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হয়েছে তাকে। অভাবের সাথে যুদ্ধ করতে করতে জয় হাফিয়ে ওঠেন। সংসারে শুরু হয় অশান্তি। এক পর্যায়ে চাকুরী ছেড়ে জয় কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন । শহরের সিটি প্লাজা মার্কেটে একটি দোকান দেন। কিন্তু ব্যবসার শুরুতেই হোচট খান পুঁজি স্বল্পতার কারনে। কিন্তু জয় অদম্য। তার শেষ চেষ্টা । এই ব্যবসায় সফল হতে হবে। যে কোন উপায়ে তাকে ২টি সন্তান আর বৃদ্ধ মায়ের মুখে হাসি ফোঁটাতে হবে। তাই জয় কোমর বেঁধে নেমে পড়েন। তিনি ব্যবসাকে বড় করার জন্য প্রথমে বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে টাকা ধার নেন। তার পর হাত বাড়ান বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দিকে। পর্যায় ক্রমে জয় সিটি ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিং সোসাইটি, আর আর এফসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা লোন নেন। যা দিয়ে তিনি দোকানে রেডিমেট কাপড় তোলেন। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দার কারনে কাপড় ব্যবসায় ধ্বস নামে। বেচা কেনা ঠিক মতো না হলেও কনজুমার লোনের সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে হাফিয়ে ওঠেন জয়। অভাবের সংসারে লোন ও তার সুদ বাড়তি ঝামেলা হয়ে দেখা দেয়। কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হিমসিম খেতে হয়। জয়ের জীবনে ঘটে ছন্দ পতন। সে লোনের কিস্তি পরিশোধ করতে দিনে দিনে বাড়তি লোনের জালে আটকে পড়েন। এক পর্যায়ে জীবনের প্রতি জয়ের বিতৃষ্ণার জন্ম হয়। অভাব অনটনের সাথে সংসারের অশান্তি তাকে পাগল করে তোলে । সুস্থ্য সবল জয় ক্রমে ক্রমে মানসিক রোগীতে পরিনত হন। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে জয় সমাজ ও পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে লোনের বোঝা অন্য দিকে সংসারের বোঝা – দুইয়ে মিলে জয়ের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। জীবন সংগ্রামে পরাজিত হয়ে জয় মৃত্যুকে বেঁচে নেয়্ মৃত্যুর কোলে সে নিজেকে সোপর্দ করে সবাইকে জালা আর যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তি দেয়। নিহতের স্বজনরা জানান, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে জয় পাগল প্রায় হয়ে যায়। অভাবের অক্টোপাশে আটকে জয়ের কাছে জীবনের সংগা পাল্টে যায়। গতকাল রোববার রাতে জয় হঠাৎ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।জয়ের স্ত্রী মেঘলা জানান, রাতের খাবার খেয়ে জয় ঘুমাতে যায়। তার পর কি মনে করে সে হঠাৎ করে বেড থেকে নেমে পড়ে। জিঙ্গেস করলে সে জানানয় বাইরে থেকে ঘুরে আসি। এই কথা বলেই সে ক্যাজুয়াল ড্রেসে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। তার পর আর বাড়ি ফেরেনি। সারা রাত সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ খবর করে কোন সন্ধান পায়নি। পরে আজ সোমবার সকাল ৭টার দিকে খবর পায় খয়েরতলা রেলক্রসিংয়ের কাছে একটি লাশ পড়ে আসে। দ্রুত ঘটনা স্থলে গিয়ে দেখি আমার কপাল ভেঙ্গে গেছে। মুছে গেছে সিঁথির সিদুর। কথা বলতে বলতে মেঘলা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মায়ের কি হয়েছে তা জানতে এসময় জয়ের ২ শিশু পুত্র জিসু আর অংশু মায়ের অচেতন শরীরেও উপর আচড়ে পড়েন। সে দৃশ্য দেখে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। পুলিম জানায়, নিহত জয় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল্ তাদের ধারনা গত রাতে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে হাটতে হাটতে খয়েরতলা এলাকার দিকে যায়। এসময় সে বেহাল অবস্থায় রেল লাইন ধরে হাটতি শুরু করে। ধারনা করা হচ্ছে এই রেল লাইন ধরে হাটার সময় রেলে কাটা পড়েই তার মৃত্যু হয়েছে । পুলিশ এই মৃত্যুকে একটি দূর্ঘটনা বলে আখ্যায়িত করছেন। এদিকে জয়ের মৃত্যু খবরে তার স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। অস্মভব মেধাবী জয়ের জীবনের এই শেষ পরিনতি কেউ স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারছেন না।