জাতীয় ঢাকা

বিপন্ন পরিবেশে শেরপুরে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় পাখ-পাখালি

male-oriental-magpie-robinশেরপুর থেকে শাহরিয়ার আহম্মেদ শাকির:পরিবেশের ওপর প্রতিকুল প্রভাব পড়ায় জীববৈচিত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সংকুচিত হয়ে পড়েছে বহু বন্য প্রানী ও দেশীয় পাখ-পাখালির আবাস স্থল। অনেক পাখি এবং প্রাণী প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। বণ্যপ্রানী সংরক্ষন আইন প্রত্যন্ত গ্রামে কার্যকর করার সরকারী কর্মচারী নেই। ফলে কোকিল, বউ কথা কও, টিয়া, ময়না, ঘুঘু, শালিক, চড়–ই, বাবুই, টুনটুনি, মাছরাঙা, বক, কোয়েল, পাতিকাক, দাড়কাক, কবুতর, কাঠ ময়ুর, বালিহাঁস, চন্দনা, হরিয়ালসহ আরো অনেক প্রজাতির পাখির আর দেখা মিলে না। নিশুতি রাতে এখন আর ডাহুকের মিষ্টি ডাক শোনা যায়না। আগের দিনে অনেক প্রজাতির ঘুঘুর বিচরণ ছিল। ঝাঁক বেঁেধ চলতো। সকাল বেলা ঘুঘুর মিষ্টি ডাক শুনে ঘুম ভাঙ্গতো। ব্যাপক নিধনের ফলে এখন আর ঘুঘুর খুব একটা ডাক শোনা যায়না। ঘুঘু প্রজাতির পাখি এখন বিলুপ্তি হওয়ার পথে। ফাঁদ পেতে ঘুঘু শিকার অব্যহত রয়েছে। ঘুঘুরই এক প্রজাতি হারিয়াল এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বুলবুলি পাখিরও এখন আর দেখা মিলে না। আগের দিনে উচু তাল বা নারিকেল গাছে বাবুই পাখির সাদৃশ্য বাসা নজরে পড়তো। এখন খুব কমই বাবুই পাখির বাসা দেখা যায না।

প্রানী বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানাযায়, শেরপুরে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী আবহাওয়া, কীট নাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি, পাখিদের আবাসস্থল ও খাদ্য সংকট এবং পাখি শিকারীদের দৌড়াত্ব বৃদ্ধির কারণে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় নানা প্রজাতির পাখি। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শেরপুরে স্বাধীনতার পূর্বে যে পরিমাণে দেশীয় পাখির বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে ৪২ বছর পর বর্তমানে সে পরিমাণের পাখি আর দেখা যায় না। এসব পাখিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কোকিল, বউ কথা কও, টিয়া, ময়না, ঘুঘু, শালিক, চড়–ই, বাবুই, টুনটুনি, মাছরাঙা, বক, কোয়েল, পাতিকাক, দাড়কাক, কবুতর, কাঠ ময়ুর, বালিহাঁস, চন্দনা, হরিয়াল ইত্যাদি। এসব পাখি হারিয়ে যাওয়ার পিছনে কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, প্রায় ৪২ বছর পূর্বে দেশের বিভিন্ন আবাদি জমি বা খেত খামারে কোন জৈব বা ইউরিয়া সার, বিষ-কীটনাশক ব্যবহার করা হতো না। বর্তমানে ধান, পাট, গমসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজি খেতে পোকা নিধনের জন্য এক ধরনের বিষ ও কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে ওইসব খেতে পাখিরা খাদ্যের সন্ধানে যেয়ে মারা পড়ছে। দেখা যাচ্ছে পাখিদের খাদ্যাভাব। এছাড়া কাজের অভাবে অনেক মানুষ পাখি শিকারকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। ফলে তারা গ্রাম গঞ্জের আনাচে কানাচে বসবাস করা বিভিন্ন প্রজাতির পাখি শিকার করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছে। সম্প্রতি শেরপুর জেলার নকলা সদরে স্থানীয় এক পাখি শিকারীকে ৫০টি টিয়া পাখি শিকার করে তা ঢাকায় বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় পরিবেশবাদী কয়েকজন পাখিগুলোকে মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দেয়। জানা গেছে, ওই পাখি শিকারীরমত আরো অনেকেই দীর্ঘ দিন থেকে জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। শেরপুর জেলায় কমপক্ষে শতাধিক জন পাখি শিকারী রয়েছে। সূত্র আরো জানায়, এক একটি টিয়া পাখি তারা খাঁচাসহ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়, একজোড়া কোয়েল পাখি ১২০ টাকায় বিক্রি করে, বক প্রতিজোড়া ৭০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করে থাকে। অপর দিকে, বৈষ্ণিক উষ্ণতা বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ে ঝড়-বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, অতি খরা এবং অতি শীতে এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে এসব দেশীয় পাখি বর্তমান পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারায়ও তারা বিলুপ্ত হতে চলেছে। এছাড়া পাখি বান্ধব বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা কেটে ভিনদেশীয় পরিবেশ বান্ধন নয় এমন গাছের বনায়ন বা বৃক্ষরোপন করায় দেশীয় পাখিরা তাদের পুরোনো চির-চেনা আবাসস্থল পাচ্ছেনা বিধায়ও তারা হারিয়ে যেতে বসেছে। বসন্তকালে শহর গ্রাম সর্বত্রই কোকিল, বউ কথা কও সহ বিভিন্ন পাখির ডাকাডাকি, কলরব, আর কিচির মিচিরে মন ভরে উঠত। বর্তমানে ওইসব পাখির কলরব খুব একটা শোনা যায় না। এসব পাখির কলরব শোনা গেলেও তা আগের তুলনায় অনেক কম। বিগত ১ যুগ পূর্বেও শেরপুর জেলা শহরের বিভিন্ন নারিকেল গাছে টিয়া, কবুতর, বক দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে কবুতরের অস্তিত্ব সামান্য লক্ষ্য করা গেলেও টিয়া ও বকের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। সন্ধ্যা হলেই গ্রাম-গঞ্জের বাঁশ ঝাড় বা বাঁশ বাগানগুলোতে চড়–ই-বাবুই পাখির কিচিরমিচিরে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় শাল গজারির বাগানে শত শত প্রজাতির দেশীয় পাখির কলরবে মুখরিত ছিল গারো পাহাড়ের বনাঞ্চল। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের সেই বাঁশ বাগানও নেই, নেই সেই গারো পাহাড়ের শাল-গজারির বনাঞ্চলও। সর্বত্রই এখন লোকালয় হয়ে যাওয়ায় পাখিদের আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়ে এসব পাখি বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। শীত মৌসুমে দেশীয় পাখি বক, সারস, কালিম, বালিহাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি জেলার বিভিন্ন হাওড়-বাওড়, বিল-জলাশয়ে বিচরণ করে। এসময় এক শ্রেণীর পাখি শিকারী তা শিকার করে জেলা সদরসহ ঢাকায় বিক্রি করে থাকে। ফলে বর্তামানে সেই এক যুগ পূর্বের ন্যায় জেলার ঐতিহ্যবাহী হাওড়াবিল, রৌহা বিল, কায়দা বিলে এখন বকের দর্শন খুব একটা মিলেনা। শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যেভাবে পাখ-পাখালি হারিয়ে যেতে বসেছে তাতে আগামী প্রজন্ম হয়ত এসব পাখির নাম শুধু বইয়ের পাতাতেই ছবির মত কল্পনা করা ছাড়া বাস্তবে দর্শন পাবে না। আর তাই এসব দেশীয় পাখি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এবং দেশের সচেতন মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। গড়ে তুলতে হবে পাখির অভয়াশ্রম, এমনটাই দাবী বিশেষজ্ঞদের।