জাতীয় ঢাকা

ফুটপাতের ‘ফাইভ স্টার’ পেয়ারা আপার হোটেল

Payra-Apa-hotel20130714163805স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,হটনিউজটোয়েন্টিফোরবিডি.কম,ঢাকা: বড় লোকদের খাবার চাইনিজ, বিরিয়ানি পাওয়া যায় নামি দামী হোটেলে। কিন্তু গরীব, দিন মজুর আর খেটে খাওয়া মানুষদের খাবার সারতে হয় ফুটপাতের অস্থায়ী হোটেলে বসেই।

তেমনি এক ভ্রাম্যমাণ খাবার হোটেল ‘পেয়ারা আপার’ হোটেল । যদিও ফুটপাতে বসা পেয়ারা আপার হোটেলের নির্দিষ্ট বা স্থায়ী কোন অবস্থান নেই।কখনও হাইকোর্ট এলাকা, কখনও প্রেসক্লাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ছবিরহাট ও শাহবাগ এলাকার ফুটপাতে হোটেল বসান পেয়ারা আপা। খদ্দেররাও সেখানে বসেই তাদের খাওয়া সারেন।পেয়ারা আপাকে ফুটপাতের বাসিন্দারা সবাই অবশ্য এক নামেই চেনে। চেনার পেছনে বড় কারণ হলো, তার হোটেলে মাত্র ২০ টাকায় ভাত আর কয়েক পদের তরকারি পাওয়া যায়।অবশ্য পেয়ারা আপার হাতের রান্নারও সুনাম আছে আশপাশের শ্রমজীবী মহলে। তাই পেয়ারা আপার খাবার খেতে নিয়মিত অনেক দূর থেকেও আসেন খরিদ্দাররা। তাদের বেশিরভাগই রিক্সাচালক, খেটে খাওয়া মানুষ আর দিন মজুর।

রোববার মধ্যরাতে তার ভ্রাম্যমাণ হোটেলে বসে কথা হয় পেয়ারা আপার সঙ্গে (পেয়ারা বেগম)।পেয়ারা আপা বলেন,‘ বিশ বছর আগে স্বামীর (ইলিয়াছ হোসেন) কঠিন রোগ হয়। স্বামীর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসি। কিন্তু টাকার অভাবে স্বামীর চিকিৎসা করাতে পারিনি। স্বামী পঙ্গু হয়ে গেছে। টাকার অভাবে ভালো খেতে পারিনি। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম কাজ করে খাবো। আমি ভালো না খেতে পারলেও আমার মতো গরীবদের ভালো খাওয়ানোর চেষ্টা করবো। সেই থেকে খাবারের ব্যবসা শুরু। দুপুরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হাইকোর্ট, ছবিরহাট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্রি করি। রাতে শাহ্বাগে।’দাম কম নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘ আগে জিনিসপত্রের দাম কম ছিল। সে সময় দৈনিক ৪-৫শ’ টাকা থাকতো। এখন জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া তাই এক ২-৩শ’ টাকার বেশি থাকে না।‘তিনি বলেন, ‘যারা আমার এখানে প্রতিদিন খায় তারাও আমার মতো গরীব। এজন্য দাম কম রাখি।’

তিনি আরও বলেন,‘ আমার নিত্য ২০-২৫ জন গ্রাহক আছে। তারা অনেক বছর ধরে খাচ্ছে। গ্রাহকরা গরীব হলেও আজ পর্যন্ত কেউ এক টাকাও মেরে খায়নি।’নিজ খাবারের প্রসঙ্গে পেয়ারা আপা বলেন,‘ হোটেলের খাবারে রোগ-জীবাণু, পোড়া তেল, নানা ধরনের কেমিক্যাল মেশানো হয়। কিন্তু আমার খাবার অত্যন্ত যত্ম করে আমি তৈরি করি। বড় বড় হোটেলের খাবার খেয়ে অনেকের অসুখ হলেও আমার খাবার খেয়ে আজ পর্যন্ত কেউ অসুস্থ হয়নি। এজন্যই আমার খাবারের জন্য সবাই আমাকে এক নামে চেনে।’

নিজ পরিবার সম্পর্কে তিনি বলেন,‘ দুই মেয়ে দুই ছেলে। পঙ্গু স্বামীকে এলাকায় একটি দোকান কিনে দিয়েছি। বড় মেয়েকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানোর পর বিয়ে দিয়েছি। বড় ছেলে ১০ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর আর পড়েনি। এখন ব্যবসা করে। ছোট ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ছোট মেয়ে ৫ম শ্রেণীতে পড়ে।‘নিজের ব্যবসা সম্পর্কে তিনি বলেন,‘সৎপথে রোজগার করি। এজন্য আল্লাহ আমাকে ঠেকিয়ে রাখেনি।’ সৎ পথে, সৎ চিন্তায় কম রোজগার হলেও তাতে যে বরকত হয়, তা সকলকে উপলদ্ধি করার আহ্বান জানান তিনি।পেয়ারা আপা বলেন,‘ মানুষ ভালো পথে চললে আল্লাহ সাহায্য করে। রমজানে আমার নিয়মিত গ্রাহকদের একটু বেশি খাওয়াই। ভালো রান্নার চেষ্টা করি। দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লেও আমি খাবারের দাম বাড়াইনি।’

পেয়ারা আপার হোটেলের পাঁচ বছরের নিয়মিত গ্রাহক রিক্সাচালক রমজান আলী হটনিউজকে বলেন,‘ আপার হাতে জাদু আছে। খাবার খুবই ভালো ও সস্তা। তাইতো যেখানেই থাকি দুপুর ও রাতে খেতে ছুটে আসি।’ তিনি পেয়ারা আপার থেকে শিক্ষা নিতে ‍অসৎ হোটেল ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান।পল্টন এলাকার হোটেল কর্মচারী সবুজ হটনিউজকে বলেন,‘ আমি চারবছর ধরে হোটেলে চাকরি করি। কিন্তু হোটেলের খাবার খেয়ে আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে গেছি। তাই হোটেলের খাবার বাদ দিয়ে পেয়ারা আপার খাবার খাই।’

এভাবেই নিম্ন আয়ের মানুষের ক‍াছে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে ফুটপাতের ‘ফাইভ স্টার’ পেয়ারা আপার হোটেল।