জাতীয় ঢাকা

ফের পলিথিনে বাড়ছে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ

Polythene-garbage-bg20130712201429হটনিউজটোয়েন্টিফোরবিডি.কম,ঢাকা: বর্ষা এলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেশে পলিথিন ব্যবহারের হার বেড়ে যায়। বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচার জন্যই মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা কাজ করে। যদিও বাংলাদেশে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ ২০০২ সাল থেকে।কিন্তু, বিকল্প কোনো ব্যবস্থা পলিথিন ব্যাগের মতো এত সহজলভ্য নয় বলে এখনও পলিথিন ব্যাগকে ‘না’ বলতে পারছেন না শহর কিংবা গ্রামের মানুষেরা।

অপচনশীল এই দ্রব্যের ব্যবহারে আমাদের চারপাশ হয়ে উঠছে বসবাসের অযোগ্য!

ছোট একটি শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কথাই ধরা যাক, বর্ষায় এ শহরে অত্যধিক পলিথিনের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। সদর উপজেলার চারপাশে বিভিন্ন খালের পাশে পলিথিন পড়ে রয়েছে স্তরে স্তরে।

মফস্বলের এই শহরটিতে পলিথিন ব্যবহারের পর যেখানে সেখানে ফেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থাপনা লক্ষ করা গেছে; পরবর্তীতে যা শহরে একটু বৃষ্টির ফলেই জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এ রকম সারাদেশের সব শহরেই।

এটা ঠেকাতে যেমন আইন তৈরি হয় না, তেমনি প্রচলিত আইনের প্রয়োগও ঘটতে দেখা যায়না। শুধু মাঝে-মধ্যে কিছু জরিমানা আরোপ করা হয় মাত্র। কিন্তু, রাজধানীর বাইরে সেই উদ্যোগটাও সীমিত।

পলিথিন ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিমুল স্টোরে কর্মরত হানিফ বলেন, “কাস্টমাররাই চায়। তাই, প্রতিটা সামগ্রীর সঙ্গে পলিথিন সরবরাহ করা লাগে।”

এ ছাড়া পলিথিন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কথা কখনই শোনেননি বলে জানালেন তিনি।

এদিকে, পলিথিনের এমন যথেচ্ছ ব্যবহারের ভবিষ্যত ‘ভয়ানক’ বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পরিবেশবিদ ড. সুব্রত কুমার সাহা।

তিনি হটনিউজকে বলেন, “পলিথিন শুধুমাত্র যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে তা নয়, এটি সমুদ্রের তলদেশে নানা সময়ে নানা ধরনের প্রাণীর জীবনহানি ঘটাচ্ছে। যেমন- ডলফিন, কচ্ছপ, পেঙ্গুইন না বুঝেই খাদ্য মনে করে পলিথিন খেয়ে ফেলে এবং পরবর্তীতে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়।”

তিনি বলেন, “আর তাছাড়া পলিথিন যখন নদী-খালের তলদেশে গিয়ে জমা হতে থাকে, তখন তার সঙ্গে পলি জমে জমে বালির বস্তায় পরিণত হয় এবং খাল কিংবা নদীর প্রবেশপথ আটকে দেয়। শহরাঞ্চলে ড্রেনের মুখও আটকে যায় একইভাবে, যা পরবর্তীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে।”

তিনি বলেন, “এছাড়া বর্ষাকালে মাঠে ফসল রক্ষার জন্য বড় বড় প্লাস্টিক শিট ব্যবহার করে থাকেন কৃষকেরা। তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেলে সেই মাটিতেই পড়ে থাকে। কিন্তু, একটি পলিথিন মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে ১০০ থেকে ৪০০ বছর।

তাই, সেসব পলিথিন মাটিতে অপচনশীল অবস্থায় বিদ্যমান থাকে এবং মাটির উর্বরতা কমিয়ে আনতে থাকে। আমাদের দেশে প্রতিটা ক্ষেত্রে তাই হচ্ছে।”

পলিথিনের ব্যবহার কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না এ প্রশ্নের জবাবে ড. সুব্রত কুমার সাহা বলেন, “পলিথিন ব্যাগ খুবই সস্তা এবং এর বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব কোনো ব্যাগের সহজলভ্যতা তৈরি করা যাচ্ছেনা।”

তবে পাটের তৈরি ব্যাগ একটি বিকল্প হতে পারে বলে জানান ড. সাহা।

কিন্তু, যেখানে একটি পলিথিন ব্যাগ বিনামূল্যে পাওয়া যায়, সেখানে ২৫ টাকা দিয়ে পাটের তৈরি একটি ব্যাগ কেনার প্রতি আগ্রহ দেখা যায় না ক্রেতাদের মধ্যে। এর জন্য সবার আগে দরকার জনসচেতনতা সৃষ্টি।

মানুষ যদি বুঝতে পারেন, পলিথিনের ব্যবহার পরবর্তীতে তার নিজের জীবনকেই বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তবে তারা আর পলিথিন ব্যবহার করবেনা।

অপরদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি এ ব্যাপারে খুব বেশি কঠোর হতে দেখা যায়না। ঢাকার অভ্যন্তরে কিছু কারখানা সিলগালা করা, আর জরিমানা দেওয়ার বাইরে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই।

এনফোর্সমেন্ট উইংয়ের লোকবল ঘাটতি একটি বড় বাধা বলে জানায় পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো মফস্বল অঞ্চলগুলোতে দুই/একটা মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা ছাড়া পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের বিরুদ্ধে তেমন একটা কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।

পরিবেশবিদ ড. সুব্রত কুমার সাহা বলেন, “পলিথিন ব্যাগের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে অথবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মতো পলিথিন বা প্লাস্টিকের বোতলজাত দ্রব্য ক্রয়ের সময় ক্রয়কৃত সামগ্রীর মূল্যের থেকে বেশি দাম রাখার ব্যবস্থা চালু করতে পারে সরকার।”

বর্তমানে সারাবিশ্বে ৫০০ বিলিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ১০০ বিলিয়নই শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে। সুতরাং উন্নত বিশ্বেই যেহেতু এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা যাচ্ছেনা, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে তা করা খুবই কষ্টসাধ্য।

কিছু জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি কিছু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে পলিথিন দূষণ কমিয়ে আনা যাবে।

থাইল্যান্ডের ২০১১ সালের বন্যার পেছনেও মূল কারণ ছিল যেখানে-সেখানে পলিথিন ফেলে রাখা। এ ধরনের ভয়াবহ দূর্যোগের চিত্র সবার সামনে তুলে ধরলে মানুষের উপলব্ধি হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদ ড. সাহা।