জাতীয় ঢাকা

বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গা ভইরা লইয়্যা যায়

ifter-badal-bg20130712055915স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,হটনিউজটোয়েন্টিফোরবিডি.কম,ঢাকা: পুরান ঢাকার বিখ্যাত খাবারের নামের মধ্যে একটা আহলাদি গন্ধ পাওয়া যায়- একথা ভোজন রসিকরা এক বাক্যে স্বীকার করেন। ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গা ভইরা লইয়্যা যায়’ শব্দগুলো কোনো ছড়ার অংশ নয়।পুরান ঢাকাবাসীদের ইফতারির একটি বিখ্যাত পদের নাম এটি।এই শব্দে চকবাজারের শাহী মসজিদ এলাকা মুখরিত দেখা যাবে রোজার প্রতিটি বিকেলে। কথা বলার ফুরসত নেই বিক্রেতাদের।শুক্রবার চকবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, ইফতারের এই বাজারে ভোজন রসিক রোজাদারদের ভিড় ঠেলে চলা ফেরা করাই কঠিন। রাজধানীর নামী-দামী এলাকা থেকে ইফতার কিনতে আসা ক্রেতাদের ব্যক্তিগত গাড়ীর ভিড় তাতে বাড়তি যানজট সৃষ্টি করেছে।ইফতারটি নাম এতো লম্বা কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ বিক্রিরত মো. ইসলাম হটনিউজকে বলেন, আপনেরা নিউটাউনের মানুচ এইচব (নতুন ঢাকার মানুষ এইসব) বুঝবেন না। আমরা পুরান ঢাকার লোকজন খাওয়ার ব্যাপারে পাক্কা। মাংস,কলিজ্যা, কাবাব এইসব অনেক দামি কিন্তু মাইনচে যাতে চব (মানুষ যাতে সব) কিছুই খাইবার পারে তাই চব কিছু একলগে মিশিয়্যা খাওয়ানের ব্যবস্থা করচাল (করেছিল) আমাগো আগের মুরুব্বিরা। খাওনডার মইদে অনেক দামি দামি জিসি (এই খাবারে দামি দামি জিনিস থাকে) থাকে। তাই নাম দিচে বড় বাপের পোলায় খায়।এটি তৈরিতে কি কি উপকরণ দরকার জানতে চাইলে তিনি জানান, মুরগি (রোস্ট তৈরির পর ছোট ছোট অংশে মাংস ছাড়িয়ে), খাসির কলিজা মসলা দিয়ে ভুনার মতো করা, খাসির কিমা, আস্ত ডিম ভুনা, সূতি কাবাব, কাটা আলু মসলা মিশিয়ে সেদ্ধ করা, খাঁটি সরিষার তেল ও গাওয়া ঘি বুট সেদ্ধ। এগুলোর সঙ্গে মোট ৫২ পদের মসলা মিশিয়ে তৈরি করা হয়।মূল উপকরণ বাড়িতেই প্রস্তুত করে চকবাজারে ক্রেতাদের সামনে সাজিয়ে খা হয়। প্রস্তুত করা উপকরণ সব একসঙ্গে উন্নত মানের চিড়া মিশিয়ে কেজি দরে বিক্রি করা হয় পুরান ঢাকাবাসীদের আহলাদি ইফতার ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।

ডিজিটাল ব্যানারে লেখা ‘চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী হাজী শহীদের ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গা ভইরা লইয়া যায়’ এবং ৭৮ বছরের ঐতিহ্য লেখা সম্বলিত দোকানের মালিক মো. শহীদ হটনিউজকে বলেন, আমার ওস্তাদের নাম আচাল (ছিল) রমজান বাবুর্চি। হ্যার থিক্যা আমিও ছিকচি (তার থেকে আমি শিখেছি)। ওস্তাদের আর আমার মিল্যা ৭৮ বচর লেখচি। তয় আমার ওস্তাদের বাপ-দাদারা আরও আগে থিক্যাই এইডি করতো (ওস্তাদের পূর্বপূরুষরা অনেক আগে থেকেই এই কাজ করতেন)।

চকবাজারের আরও কয়েকজন ইফতার বিক্রেতা সেলিম বাবুর্চি, ফালান বাবুর্চি, আফজাল সবারই বংশগত পেশা বাবুর্চিগিরি। কিন্তু রমজানে সব বাদ দিয়ে নেমে পড়েন এই সব আহলাদে ইফতার তৈরি ও বিক্রির কাজে। রমজানে সব বাদ দিয়ে তাদের বাপ-দাদারাও এটিই করতেন বলে জানান তারা।এক একটি দোকানে ১০ থেকে ১৫ জন কর্মী কাজ করলেও কেউ পরিবারের বাইরের লোক নন। সবাই একই পেশায় একই কাজের সঙ্গে যুক্ত। নিজেদের আদি ঢাকাইয়্যা হিসেবে পরিচয় দিয়ে গর্বকে অটুট রাখার দৃঢ়তা তাদের।স্বাদের এই ইফতারি ক্রয় করতে গিয়ে দামাদামি করতে গেলে বিক্রেতার কটাক্ষ দৃষ্টি ক্রেতার জন্য অপমানজনক হতে পারে। তাই চকবাজারের এই বিখ্যাত ইফতারি পেতে আপনাকে কেজিতে সাড়ে ৩শ’ টাকা খরচ করতে হবে।ধানমণ্ডি থেকে বড়বাপের পোলায় খায় কিনতে এসেছেন জহিরুল হক। তিনি হটনিউজকে বলেন, স্ত্রী-সন্তানরা অনেক দিন থেকেই বড়বাপের পোলায় খায় দিয়ে ইফতার করার কথা বলে আসছিল। আজ (শুক্রবার) অফিস বন্ধ। ভাবলাম তাদের স্বাদটা পূরণ করি। তাই কিনলাম কেজি খানেক।দেখতে যেমনই হোক না কেন মনের স্বাদটাই আসল। আর ঢাকায় থেকেও ঢাকার এই খাবার না খেতে পারাটিকে আপনার মফস্বলের বন্ধুটি হয়তো আপনাকে অবমূল্যায়ন করে বলবেন, ঢাকায় থেকেও এই খাবারটা খাও নাই দোস্ত?