চট্টগ্রাম জাতীয়

কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য চলছে

1371914047Moneyশাহ মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম, চাঁদপুর:বাখারাবাদ গ্যাস বিতরণ চাঁদপুর এলাকায় নতুন সংযোগের নামে দুর্নীতির নয়া কৌশল লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে যে সব গ্রাহক নতুন সংযোগের আবেদন করেছে, তাদের সংযোগ নিয়ে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন টালবাহানায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে গ্রাহকরা। নতুন ও পুরাতন সংযোগের জন্য বিতরণ কার্যালয়ের কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও দালালের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। গত কয়েক বছর ধরে চলছে অবৈধ সংযোগের ছড়াছড়ি। এছাড়াও পুরাতন রাইজার স্থানান্তর করে নতুন গ্রাহকদের বিভিন্ন নিয়ম কানুনের কথা বলে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। এমন অভিযোগ চঁাঁদপুর বিতরণ এলাকার ভুক্তভোগী গ্রাহকদের। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চাঁদপুর শহরের নতুন ভবনগুলোতে সংযোগ পাওয়ার জন্য গ্যাস অফিসে কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তাদের পছন্দমত ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করানোর জন্য বলেন। নতুন সংযোগের কাজগুলো ঠিকাদাররা দাপ্তরিক কাজসহ সকল সম্পন্ন করে দিবেন বলে গ্রাহকদের জানান। তারপর থেকেই শুরু গ্রাহকদের সাথে টালবাহানা ও প্রতারণা। সরকারি নিয়মানুযায়ী জামানত ১হাজার ৩শ’ ৫০টাকা, সংযোগ ফি ২হাজার ৭শ’ ৫০টাকা, কমিশন ফি ৩শ’ টাকাসহ মোট ৪হাজার ৪শ’ টাকা নতুন সংযোগের জন্য খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু তারা দ্রুত সংযোগ দেয়ার কথা বলে প্রতি গ্রাহকের নিকট থেকে ২০ থেকে ৫০হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ঠিকাদারদের অসংখ্য দালাল চক্র শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নতুন কোন ভবন তৈরি হলেই দালাল চক্ররা বাড়ির মালিকদের সাথে গোপনে যোগাযোগ করে দ্রুত গ্যাস সংযোগ এনে দেয়ার নাম করে সখ্যতা শুরু করে। ঠিকাদার চক্রটি নয়া কৌশল হিসেবে কর্মকর্তাদের টাকা দিবে বলে টাকা আদায় করছে। অপরদিকে ঠিকাদারদের মাধ্যমে কর্মকর্তারা নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। গ্যাস অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার সদর, হাজীগঞ্জ, মতলব ও ফরিদগঞ্জ উপজেলার মোট ৩ হাজার ৭শ’ ৩০টি আবাসিক গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন জমা পড়েছে। এছাড়া বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন পড়েছে ১৮টি। ২০১০ সালে নতুন সংযোগের জন্য আবেদনকারী গ্রাহকদের মধ্যে ২ হাজার সংযোগ দেয়ার অনুমোদন হয়েছে। নতুন রাইজার স্থাপন করে গ্যাস সংযোগ দেয়ার জন্য ৭৫% কাজ শেষ হয়েছে। প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পরে বাকী আবেদনকারী গ্রাহকদের পর্যায়ক্রমে সংযোগ দেয়া হবে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩শ’ নতুন ফাইল জমা পড়েছে। আবেদনকৃত গ্রাহকদের মধ্যে কোম্পানির নিয়মনীতির মাধ্যমেই সংযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও দালাল চক্র প্রতারণার মাধ্যমে সংযোগের জন্য সিরিয়ালে এগিয়ে দেয়ার নাম করে প্রত্যেক গ্রাহক থেকে ৫ হাজার টাকা করে অগ্রিম হাতিয়ে নিচ্ছে। গত কয়েক বছর সরকারের পক্ষ থেকে আবাসিক সংযোগ বন্ধ ছিলো। এ সুযোগে গ্যাস অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে ঠিকাদার ও দালাল চক্র বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে ১ সংযোগের অনুমোদন থাকলেও ওই সব সংযোগ থেকে নতুন চুলার আবেদন না করে নিয়মিত মাসিক টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে পুরো শহরে শত শত চুলার টাকা উত্তোলন করেছে। যার ১টি টাকাও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। তাদের এমন চুরির মহা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে। এতে গ্যাস অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেখানে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছন্ন করার কথা, তা না করে শুরু করে অবৈধ সংযোগ প্রদানের হোলি খেলা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী একাধিক গ্রাহক জানায়, পুরাতন সংযোগ নতুন গ্রাহকদের মাঝে বিতরণের নাম করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সংযোগে দালাল, ঠিকাদার ও কর্মকর্তারা আবাসিকের ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৫০হাজার টাকা ও বাণিজ্যিক সংযোগের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছে। খুব অল্প সময়ই তারা এসব অবৈধ অর্থ দিয়ে বাড়ি, গাড়ি ও টাকার পাহাড় তৈরি করেছে। পুরাতন একটি রাইজার নিয়ে তারা বেশ কয়েকজন গ্রাহকের কাছে বিক্রির নাম করে এসব টাকা আত্মসাৎ করে। বাখারাবাদ গ্যাস বিতরণ চাঁদপুর অফিসের এসব দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধানে সেই অফিসে গেলে ওই অফিসের ব্যবস্থাপক মোঃ আঃ কাদের তথ্য দেয়া যাবে না, উপরের মহলের নির্দেশ রয়েছে বলে জানায়। এ সময় তিনি আরো জানান, ১১ জুন ২০১২ সালে পেট্টো বাংলার চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে কোম্পানি প্রধানদের নিয়ে মাসিক আলোচনা সভায় গ্যাস অফিসের কোন তথ্য কোন সংবাদ কর্মীদের না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৮ জুন ২০১২ তারিখে ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মাহফুজুল হক খান তথ্য না দেয়ার জন্য চাঁদপুর অঞ্চলে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। ২০১২ সালের ওই চিঠির বরাদ দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের কোন ধরনের তথ্য দিতে অপারগতা স্বীকার করেন। চাঁদপুর গ্যাস অফিসে লাইসেন্স প্রাপ্ত ঠিকাদারদের মাধ্যমে নতুন সংযোগ দেয়া হয় বলে তিনি জানান। গ্যাস অফিসে প্রায় ১৬ জন লাইসেন্স প্রাপ্ত ঠিকাদার রয়েছে। অফিসে গিয়ে দেখা যায় অসংখ্য দালাল ঘুরাফেরা করছে। কর্মকর্তার চেয়ে দালালের সংখ্যাই বেশি। কোন গ্রাহক আসলেই তাকে মৌমাছির মত ঘিড়ে ধরে। এমনই কয়েকজন ২০১০ সালের নতুন সংযোগ প্রাপ্ত গ্রাহক সংযোগ নিতে আসলে তাকে অফিস ব্যবস্থাক ও অন্যান্য কর্মকর্তারা ঘুষের জন্য বিভিন্ন টালবাহানা শুরু করে। এদিকে গ্যাসের চুলা নিয়ে গ্রাহকদের পড়তে হচ্ছে নতুন এক বিড়ম্বনায়। মার্কেটে গ্যাসের চুলা কিনতে গিয়ে দাম শুনে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায়, আর হবারই কথা। কারণ, গত ৪/৫ দিন আগেও যে গ্যাসের চুলা বাজারে বিক্রি হয়েছে (ডাবল) ১হাজার ৪শ’ ৫০ টাকায়, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪শ’ টাকায়। ১ হাজার ২শ’ টাকার চুলা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২ শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।। শুধু চুলাই নয়, গ্যাস সংযোগের প্রতিটি পণ্যেরই দাম বেড়েছে কয়েকগুণ বেশি। যেমন হাফইঞ্চি জি.আই.পাইভ, থ্রি ফোর জি.আই.পাইভ, জি.আই. ফিটিংস গ্যাসকর্ক, গ্যাস পাইপ টেপ, গ্যাস বার্নার, গ্যাস ঝালি ইত্যাদি। এ ব্যপারে একটি কোম্পানির মার্কেটিং অফিসারের সাথে আলাপ কালে তিনি জানান, চাঁদপুরের ন্যায় সারা বাংলাদেশে এক যুগে বাসা-বাড়িতে ও বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ দেয়া চলছে। এ জন্য হঠাৎ করেই ডাবল চুলার চাহিদা বেড়েছে আগের চেয়ে ৪/৫ গুণ বেশি। যার জন্য কোন কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারছেনা। এজন্য মার্কেটগুলাতে চুলা ও জি.আই ফিটিংসহ গ্যাস সংযোগের সাথে সম্পর্কিত পণ্যগুলোর কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে