জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর লাইফ স্টাইল

হায়রে চরমপন্থা – মশা ভাইর ঠিকনা হলো ঢাকার বস্তিতে

6_layekuzzaman লায়েকুজ্জামান: মশা । পুরো নাম মোশাররফ হোসেন। মশা নামেই লোকে চিনে তাকে। নাম জানি অনেকদিন ধরে। দেখাসাক্ষাত হয়নি। তখোন তিনি পলাতক। মীর ইলিয়াস হোসেন দীলীপ খুন হবার ক’দিন আগেই ঝিনাইদহ ছেড়েছেন তিনি। না হলে নির্ঘাত মারা পড়তেন,এটা জেনেছি ঝিনাইদহের চরমপন্থীদের কাছ থেকেই। চরমপন্থীরা তাদের মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলো। সরকার রক্ষা করতে পারেনি। মোহাম্মাদ নাসিম তখোন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। তিনিও কথা রাখেননি। বছর খানেক মশা ভাইর সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই। বেচেঁ আছেন কি না জানি না। তবে শেষবার যখন দেখা তখোন তার কাহিল অবস্থা। হার্টে চারটে ব্লক। অপারেশন করার টাকা খুজঁছেন হন্যে হয়ে। বলেছিলেন ভাই এখন কেউ আমাকে টাকা দেবে না। হয়তো বিনা চিকিৎসাতেই মারা যাবো।
১৯৯৬ সালে নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ তখোন ক্ষমতায়। মেজর রফিকুল ইসলামকে বাদ দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী করা হয়েছে মোহাম্মাদ নাসিমকে। দক্ষিন পশ্চিমান্চলের দশ জেলায় সে সময়ে চরমপন্থার দাপাদাপিতে অতিষ্ঠ মানুষ। প্রতিদিন লাশ পড়ছে। ঘোষনা দিয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। শ্রেনী শত্রু খতমের শ্লোগান দিয়ে চলছে হত্যাকান্ড।
মোহাম্মাদ নাসিম উদ্যোগ নিলেন,চরমপন্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবেন। কর্মসূচী নেয়া হলো তাদের আত্মসমর্পনের। যশোর খুলনা ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াতে কয়েক দফা আত্মসমর্পন হয়ে গেল। এ নিয়ে বানিজ্য বেসাতির কথাও উঠলো। কয়েকজন নামকরা সাংবাদিকের নামও জড়িয়ে গেল সে বানিজ্যে।
আত্মসমর্পন করতে চরমপন্থীরা বেশ কিছু শর্ত দিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে অলিখিত সমঝোতা হয় সাতটি চুক্তিতে। চরমপন্থীদের পক্ষ থেকে প্রধান শর্তটি দেয়া হয়েছিলো আত্মসমর্পনের পর তাদের নামে দায়ের হওয়া মামলাগুলো তুলে নিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সরকারের পক্ষে সেটা মানা হয়েছিলো। তবে আত্মসমর্পনের পর সরকার সে কথা রাখেনি। যাদের নামে কোন মামলা ছিলো না তাদেরকে আনসারে নেয়া হয়েছিলো। অন্যদেরকে পাঠানো হয় কারাগারে। এ নিয়ে বিক্ষুদ্ধতার সৃষ্টি হয় চরমপন্থীদের মাঝে। তারা ক্ষেপে উঠে।
এক সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউষ্ট পাটি হক গ্রপের সঙ্গে ছিলেন ঝিনাইদহের মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ। পরে সেখান থেকে বের হয়ে গঠন করেন বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পাটি। ওই পাটিতেও ভঙ্গন ধরে। রাজনীতি থেকে প্রায় বিদায় নিতে প্রকাশ্যে আসেন দিলীপ। ঝিনাইদহ থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। আত্মসমর্পন প্রক্রিয়া শুরু হলে সরকারের পক্ষ থেকে চরমপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ এবং মশাররফ হোসেন মশা। বাস্তবে তারা দুজনেই চরমপন্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আত্মসমর্পনে রাজী করান। দিলীপ চরমপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও মশা তা ছিলেন না।
মশা ভাই ছিলেন ব্যাবসায়ী। তার মরহুম পিতা দীর্ঘদিন ধরে ঝিনাইদহের পাগলা কানাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। মশা ভাইর কাছে চাদাঁ দাবী করার কারনে একটি চরমপন্থী দলের সঙ্গে বিরোধ বাধে তার। সে বিরোধই তাকে টেনে নিয়ে চরমপন্থী রাজনীতির ভেতরে। তিনি সাহায্য নেন আরেকটি চরমপন্থী সংগঠনের। এভাবেই এক সময়ে জড়িয়ে পড়েন তিনি। চরমপন্থী যন্ত্রনা থেকে বাচঁতেই মূলত আত্মসমর্পন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন তিনি। তবে এটাই এক সময়ে তার জীবনের কাল হয়ে দাড়াঁয়। একদিকে চরমপন্থী অন্যদিকে পুলিশের গান পয়েন্টে পড়েন তিনি। সে সময়ে একটি রিপোর্ট করতে গিয়ে জানতে পারি দিলীপ এবং মশার ঘটনা। এক চরমপন্থী নেতা সাবধান করে দিয়েছিলেন যাতে ঝিনাইদহ শহরে প্রকাশ্যে দিলীপের সঙ্গে কোন আড্ডায় না বসি। চরমপন্থী নেতার সে ভাষা আমি বুঝেছিলাম। ফোনে দিলীপকে সেটা জানিয়েছিলাম। দিলীপ অকপটে বলেছিলেন,ভাই আমিও জানি আমার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। এখন আর কিছু করার নেই।
খবরটা পেলাম রাতে। ঝিনাইদহ শহরের পাগলা কানাই মোড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপকে। তখোন ভাবছিলাম মশা ভাইর কথা। চরমপন্থী নেতা আমাকে ওই নামটিও বলেছিলো। কি কারনে তাদের হত্যা করা হবে সেটাও বলেছিলো।
এ ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর। ঢাকায় বসবাসকারী ঝিনাইদহের এক সাংবাদিক বন্ধু ফোন করলেন , সময় থাকলে একটু মোহাম্মাদপুরের অমুক ঝায়গায় আসেন একজন লোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। ওই বন্ধু সাংবাদিকের নানা স্তরে যোগাযোগের খবর আমার জানা। বুঝলাম নিশ্চয়ই কোন চরমপন্থী নেতার সঙ্গে পরিচয় হবে। দেরী না করে চলে গেলাম। একটি হোটেলে খাটের ওপর বসে আছেন মুখভর্তি দাড়িয়ালা ভগ্ন চেহারার মাঝ বয়েস পেরুনো এক ভদ্রলোক। েিনজই পরিচয় দিয়ে বললেন,ভাই আমিই ওকে বলেছি আপনার সঙ্গে একটি আলাপ করিয়ে দিতে। অনেকদিন ধরে আপনার নাম জানি ,দেখাসাক্ষাত হয়নি মূলত এ কারনেই। এছাড়া আপনার কাছে কিছু কথা বলবো।
জানতে চাইলাম,মশা ভাই আপনি তো ছিলেন ব্যবসায়ী,চরমপন্থী হলেন কি ভাবে। বললেন,ভাই সে কথাগুলোর জন্যই আপনাকে ডেকেছি। জীবনে যদি কখনো সুযোগ পান আমার কথা গুলো লিখবেন। বাবা ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। নিজে ছিলাম ব্যাবসায়ী। এখন আমার গায়ে চরমপন্থী তকমা। পালিয়ে জীবন বাচাঁকে হচ্ছে। ঢাকায় থাকি বস্তিতে। স্ত্রী অসুস্থ। টাকা পয়সার অভাবে ছেলেটার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। আমার শত্রু দুই দিকে। চরমপন্থীরা খুজঁছে,পেলে খুন করবে। তারা মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করেছে। আবার পুলিশও আমার ওপর রাগ তারা পেলে ক্রসফায়ার দেবে।
এমন কেন হলো? ভাই আসলে না বুঝে বোকামিটা করেছি আমি। সরকারের একটি মাধ্যম আমাকে অনুরোধ করেছিলো চরমপন্থীদের আত্মসমর্পনে সহযোগিতা করতে। মানে সরকারের লোকদের সঙ্গে চরমপন্থী নেতাদের যোগাযোগ করে দিতে। আমি কাজটা করেছিলাম মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে। দীলিপ এক সময়ে চরমপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলো। তবে আমার ইন্টারেস্ট ছিলো ভিন্ন জায়গায়। সেটা অন্য কাহিনী। বেশ কয়েকটি চরমপন্থী সংগঠন আমার কাছে চাদাঁ দাবী করেছিলো। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আমার বিরোধ চলছিলো। তখোন আমি চেয়েছিলাম চরমপন্থীরা আত্মসমর্পন করলে এলাকা ঝামেলামুক্ত হবে মানুষ শান্তিতে ব্যাবসা বানিজ্য করতে পারবে। তার আর হলো না । উল্টো নিজেই ফেসে গেলাম।
ঝামেলাটা কোথায় বাধলো? ভাই আমাদেরকে ফাসিঁয়ে দিয়েছে বলতে গেলে সরকার ,মানে মোহাম্মাদ নাসিম। সেটা আবার কেমন? সাতটি শর্তে চরমপন্থীরা আত্মসমর্পনে রাজী হয়েছলো। তার মধ্যে চরমপন্থীদের পক্ষ থেকে প্রধান শর্ত দেয়া হয়েছিলো,আত্মসমর্পনের পর তাদেরকে মুক্ত করে দিতে হবে। তাদের মামলাগুলো তুলে নিতে হবে। সরকার অন্য শর্তগুলো মানলেও তাদের প্রধান শর্তটিই মানেনি। আত্মসমর্পনের পর তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়। এদের অনেকের নামেই ডজন ডজন হত্যা মামলা ছিলো। আত্মসমর্পন না কররে এরা সারাজীবন আন্ডারগ্রাউন্ডেই কাটিয়ে দিতো। পুলিশ এদের টিকিটা স্পর্শ করতে পারতো না। আত্মসমর্পন করে এরা ধরা খেলো। সরকার শর্ত ভঙ্গ করার পর চরমপন্থীরা ক্ষুদ্ধ হলো আমাদের ওপর। আমরা যারা আত্মসমর্পনের দেনদরবার করেছিলাম ,তাদেরকে ওরা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করলো। আমাদের মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করলো সবগুলো চরমপন্থী সংগঠন একযোগে। বিপদে পড়ে গেলাম। দ্রুত এলাকা ছাড়লাম। মীর ইলিয়াস হোসেন দীলিপ এলাকার ছাড়ারও সুযোগ পেল না। দুখের বিষয় হলো দিলীপ মারা যাবার চারপাচঁ দিন আগে থেকে সে ঘেরাও অবস্থায় ছিলো। তাকে ঘিরে রেখেছিলো চরমপন্থীরা। দীলিপ বারবার পুলিশকে জানিয়েছিলো তাকে হত্যা করা হবে। জীবন রক্ষার আকুতি জানিয়ে ছিলো। কিন্ত পুলিশ তাকে কোন সহযোগিতা করেনি।
এখানে বলা দরকার,চরমপন্থীদের একটি অংশ শুরু থেকেই আত্মসমর্পনের বিরোধী ছিলো। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো নিউ বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পাটি । এ পাটির প্রধান নেতা তখোন কুষ্টিয়ার শাহীন এবং মুকুল। এ ছাড়া দাদা তপনের পাটিও এ প্রক্রিয়ার বিরোধী ছিলো। তারাও আমাদেরকে শ্রেনী শত্রু হিসেবি চিহ্নিত করে , পুলিশ ও সরকারের দালাল বলে ঘোষনা করলো। যে সকল চরমপন্থী নেতা কারাগারে আটকা পড়লো তারাও ধারনা করলো আমরা কৌশলে সরকারের সহযোগী হিসেবে তাদেরকে আত্মসমর্পনের নামে ধরিয়ে দিয়েছি। তাদের যে সকল ক্যাডার আত্মসমর্পন করেনি,জেলের বাইরে ছিলো তাদের কাছে চিরকুট পাঠাতে শুরু করলো আমাদেরকে হত্যা করতে। অন্যদিকে পুলিশ আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হলো।
পুলিশ ক্ষিপ্ত হওয়ার কারন কি? আরে ভাই এটা তো সহজ হিসাব। মাঠে চরমপন্থী আছে,খুনখারাবি হচ্ছে,চরমপন্থী বলে সাধারণ মানুষকে ফাসিঁয়ে দিয়ে পুলিশের আয় রোজগার তো ভালোই ।এছাড়া চরমপন্থী সংগঠন গুলোও এদেরকে টাকা পয়সা দেয়। না দিলে পুলিশ এদের আত্মীয় স্বজনকে ধরে নিয়ে আসে। এখন চরমপন্থী না থাকলেও তো পুলিশের এ আয়রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে। সে কারনে পুলিশ আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত। দীলিপ খুন হয়ে গেল। আমি পালিয়ে এসেও বাচঁতে পারছি না। পুলিশ তাদের রিপোর্টে আমাকে চরমপন্থী নেতা বানিয়ে দিলো। এখন ঝিনাইদহে নতুন যে পুলিশ যায়,র‌্যাব যায় গোয়েন্দারা যায় চরমপন্থী নেতা হিসেবে তারা আগে আমাকে খুজেঁ।
এর মাঝে আরেক বিপদে পড়লাম। বিভিন্ন দুর্গম এলাকা দিয়ে পালিয়ে বেড়াই। কুষ্টিয়ার চরমপন্থী মুকুল- শাহীনের কাছে খবর পৌছালো আমি তাদের ওপর আঘাত করতে নিজেই একটি চরমপন্থী দল গুছিয়েছি। তারা লাগলো আমার পেছনে। ঝিনাইদহের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পাচঁ লাখ টাকা দিয়ে আমাকে ক্রসফায়ারে হত্যার ব্যাবস্থা করলো। গোপনে একদিন ঝিনাইদহ গেলাম পুলিশের দায়ের করা একটি মামলায় হাজিরা দিতে,আদালত প্রাঙ্গন থেকেই ওই পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে গ্রেপ্তার করলো। রাতের বেলায় নিয়ে গেল ক্রসফায়ার দিতে। যাহোক বেচেঁ গেলাম আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তার দয়ায় এবং আমার নামে কোন হত্যা মামলা না থাকার কারনে। রাতের বেলায়ই ফিরে এলাম ঢাকায়। এখন আছি ঢাকাতে ,থাকি বস্তিতে। হার্টের অসুখ। চিকিৎসার টাকা নেই। গত দশ বছরে বাবার জমিজমা যা ছিলো তা সবই বিক্রি করে খেয়েছি। বেচেঁ থাকার জন্য পুলিশকে দিয়েছি। স্ত্রী আর স্তানকে বাচিঁয়ে রাখতে চরমপন্থীদেরও দিতে হয়েছে। হয়তো আর বেশী দিন বাচঁবো না। কখনো সুযোগ এলে আমার কথা গুলো লেখার অনুরোধ থাকলো।