শিক্ষাঙ্গন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব ব্যাঙ সংরক্ষণ দিবস উদযাপন

১১নিজস্ব প্রতিবেদক, হটনিউজ২৪বিডি.কম ৩ মে : বর্ষা আসলেই ব্যাঙের ডাকে মুখরিত হবে প্রকৃতি। দৃশ্যটি শুধু যে গ্রামে পরিচিত তা নয়, শহুরে কোলাহলের মধ্যে একটু জলাশয় পেলেই অন্যান্য প্রাণির মতো প্রজননের তাগিদে ব্যাঙগুলো ব্যস্ত হয়ে ওঠে। আকারে ছোট এই উভচর প্রাণিটিকে আমরা সবসময়ই অবহেলার চোখে দেখি। কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং আমাদের মত কৃষিভিত্তিক দেশে ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমনে ব্যাঙের গুরুত্ব আমরা হয়তো খুব কমই অনুভব করি।

প্রকৃতির সব কিছু মিলেই একটি বাস্তুতন্ত্র, যার মধ্যে আমাদেরও বসবাস। মানুষের মত ব্যাঙও প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু অবহেলা আর জ্ঞান স্বপ্লতার কারণে আমরা নানাভাবে প্রকৃতির বিনষ্ট করছি, এক অর্থে আমরা নিজেদেরই ক্ষতি করছি।

ব্যাঙ উভচর প্রাণি। জলায় এবং ডাঙায় উভয়ক্ষেত্রেই এদের অবাধ বিচরণ। আর এই জন্যই অন্যান্য প্রাণির চেয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নানা কারণে ব্যাঙ আজ বিলুপ্তির পথে। পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যাঙ আজ সংকটাপূর্ণ অবস্থায়। আর আমাদের দেশে এই অবস্থা খুবই নাজুক। কেননা ব্যাঙ নিয়ে আমাদের দেশে গবেষণা হয় না বললেই চলে। ফলে আমাদের দেশের ব্যাঙগুলো কি অবস্থায় আছে তা সঠিকভাবে বলা খুব কঠিন। তবে আবাসস্থান ধ্বংস, নানাবিধ সংক্রামক রোগ, পরিবেশ দূষণ ও কৃষিক্ষেতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত হারে প্রকৃতি থেকে ব্যাঙ সংগ্রহ এবং মেরে ফেলা প্রভৃতিকে ব্যাঙ বিলুপ্ত হওয়ার কারণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণায় তরুণ শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করতে প্রথমবারের মত শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ব্যাঙ সংরক্ষণ দিবস-২০১৬ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

বিভাগীয় চেয়ারম্যান ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বণ্যপ্রাণি শাখা দেশে প্রথম বণ্যপ্রাণি নিয়ে গবেষণা এবং সংরক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করে । সুতরাং বণ্যপ্রাণি তথা ব্যাঙ সংরক্ষণে আমাদেরকেই মূখ্য ভূমিকা নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা শুধু মেগাফনা (বাঘ, হাতি প্রভৃতি) সংরক্ষণে নানা উদ্যোগে নিচ্ছি। ফলে অবহেলার কারণে এখন আমরা প্রকৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণি ব্যাঙ সংরক্ষণে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছি না। ব্যাঙ সংরক্ষণে শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগের অনেক প্রশংসা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাঙ নিয়ে গবেষণা বৃদ্ধিসহ সংরক্ষণে আরো উদ্যোগী হতে হবে।

বিভাগীয় বণ্যপ্রাণির শাখার শিক্ষক, প্রফেসর ড. ফিরোজ জামান বলেন, গবেষণায় অনাগ্রহ এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ আমাদের দেশের নানা প্রজাতির ব্যাঙ সংকটাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রথমবারের মত বিভাগীয় শিক্ষার্থীদের বিশ্ব ব্যাঙ সংরক্ষণ দিবস আয়োজনকে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাঙ সংরক্ষণে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীদেরকে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে, সেই সাথে সাধারণ জনগণের মাঝে প্রকৃতিতে ব্যাঙের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম সাফি এবং মোহাম্মদ সামিউল আলম অনুষ্ঠানে ব্যাঙ দিবসের গুরুত্ব এবং সংরক্ষণের নানা বিষয় তুলে ধরেন। তারা বলেন, ব্যাঙ যেমন ক্ষতিকর পোকা দমন করে আমাদের উপকার করে, সেই সাথে ব্যাঙ থেকে মানুষের উপকারী অনেক ওষুধ আবিস্কার করা হচ্ছে। ব্যাঙ প্রকৃতির অন্যতম বন্ধু, সম্প্রতি জীববিজ্ঞানীদের মতে ব্যাঙ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু সায়ীদ রানা বলেন, আমাদের দেশে ব্যাঙ নিয়ে গবেষণায় সবেেচয়ে বড় অন্তরায় হলো সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণ। ছবি দেখে ব্যাঙ সনাক্তকরণের ফলে আমরা সঠিকভাবে অনেক প্রজাতি সনাক্ত করতে পারছি না। কেন শ্রেণিবিন্যাস বিদ্যার সঠিক পদ্ধতি আমাদের অনুসরণ করা উচিত এ ব্যাপারে তিনি নানারকম যুক্তি উপস্থাপন করেন।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং তরুণ বণ্যপ্রাণি (সাপ ও ব্যাঙ) গবেষক আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ এবং এদের বিস্তৃতি নিয়ে কথা বলেন। এ ছাড়াও তিনি ব্যাঙের শ্রেণিবিন্যাস বিদ্যার অসঙ্গতির নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে ব্যাঙ সংরক্ষণে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো দেশব্যাপী ব্যাঙের বিস্তৃতি সম্পর্কে তথ্য অপ্রতুতলা এবং সঠিকভাবে ব্যাঙ সনাক্তকরন। আমরা যদি না জানি আমাদের দেশে প্রকৃতপক্ষে কত প্রজাতি ব্যাঙ পাওয়া যায় এবং দেশে এদের বিস্তৃতি কোথায় তাহলে ব্যাঙ সংরক্ষণে উপযোগী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের ব্যাঙগুলোর প্রজনন এবং বাস্তুতন্ত্রে এদের ভূমিকা সম্পর্কে খুব কম গবেষণা হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাঙগুলো বর্তমানে কি কি হুমকির মধ্যে রয়েছে এবং সেগুলো কিভাবে কমানো যায় এ ব্যাপারে তিনি নানা প্রস্তাবনার কথা বলেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৯ প্রজাতির ব্যাঙ পাওয়া যায়। বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ বিভিন্নভাবে প্রকৃতি তথা মানুষের উপকার করে। তাই ব্যাঙ সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
হটনিউজ২৪বিডি.কম/এআর