জাতীয়

‘শ্রম আইন’ রক্ষাকবচের বাইরে ৫ কোটি শ্রমিক

৪৯নিজস্ব প্রতিবেদক,  হটনিউজ২৪বিডি.কম ২ মে : অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যার বাংলাদেশে অর্থনীতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য শ্রম-ঘনত্ব। দেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনোভাবে কায়িক শ্রমের সঙ্গে জড়িত। অথচ এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ৪ কোটি ৭৩ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিকের ব্যাপারে সরকারের কোনো তদারকি নেই।

এ খাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে শ্রম শোষণ। ন্যায্য মজুরি ও কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শ্রমিকেরা। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কোনো শ্রমিককেই নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। মূল বেতন ছাড়া অন্যান্য সুবিধা অল্প ও অনির্ধারিত। মজুরিতে নারী-পুরুষ বৈষম্য প্রকট। এমনকি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রম আইনের রক্ষাকবচ পুরোপুরি অনুপস্থিত। এ রকম বাস্তবতায় আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, যা সারা বিশ্বে মে দিবস হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিকসহ ৫ কোটি ৪০ লাখ ৮৪ হাজার লোক বিভিন্ন শ্রমের সঙ্গে জড়িত। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের সংখ্যা রয়েছে ৬৭ লাখ ৮৭ হাজার, যারা মূলত সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় নিয়মিত শ্রম দিয়ে থাকেন। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ ৫০ হাজার। এটি দেশের মোট শ্রমিকের ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু এ বিশাল শ্রমিকের কোনো স্বীকৃতি নেই। কোনো আলাদা পরিচয়পত্রও নেই।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সরকারের কোনো তদারকি নেই। শ্রম আইনের রক্ষাকবচ এ খাতের শ্রমিকদের জন্য অনুপস্থিত। অনিয়ন্ত্রিতভাবে শ্রম শোষণ চলছে এ খাতে। ন্যায্য মজুরি ও কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শ্রমিকরা। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কোনো শ্রমিককেই নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। মূল বেতন ছাড়া অন্যান্য সুবিধা অল্প ও অনির্ধারিত। মজুরিতে নারী-পুরুষ বৈষম্য প্রকট।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা ছাড়াই নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বেশ কয়েকটি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত উন্নয়ন ও বিকাশের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। এখান থেকে অধিকতর উন্নয়নের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে দাঁড়াতে হলে এসব খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনার পাশাপাশি অবশ্যই শ্রমিকদের সব রকম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরে কৃষি, চিংড়ি ও মৎস্য চাষ ও প্রক্রিয়াকরণ, নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট কাজ, হকার, চাতাল, সেলাই কাজ, ওয়েল্ডিং, তাঁত, বিড়ি কারখানা, প্রিন্টিং, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কর্ম, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান, ইটভাটা, গৃহস্থালি কর্ম, ছোট ম্যানুফ্যাকচারিং খাত প্রভৃতি খাতকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবে ধরা হয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) অবদান এবং কর্মসংস্থানে গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর ভিত্তি করেই এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অসংগঠিত অবস্থায় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত এবং তারা প্রচলিত শ্রম আইনে প্রদত্ত অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০০৬-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত’ হলো ‘এরূপ বেসরকারি খাত, যেখানে কর্মরত শ্রমিকের কাজের বা চাকরির শর্ত, ইত্যাদি বিদ্যমান শ্রম আইন ও তদাধীন প্রণীত বিধি-বিধানের আওতায় নির্ধারিত কিংবা নিয়ন্ত্রিত নহে এবং যেখানে কর্মরত শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।’

সে হিসাবে দেশের অধিকাংশ খাতই এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়ে গেছে।

সরকারের ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উপস্থাপিত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কর্মসংস্থানে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভূমিকা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের ধরনও বদলে যাচ্ছে। একদিকে গ্রামে যেমন কৃষিজমির আয়তন ও ফসল বৈচিত্র্যের পরিবর্তন ঘটছে, অন্যদিকে শহরে শিল্প খাতে আসছে পরিবর্তন।

গত ১০ বছরে নতুন করে সৃষ্ট কর্মসংস্থানে সরকারি খাতের অবদান মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময়ে ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বেসরকারি খাতে। বাকি শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অলাভজনক খাতে। সামগ্রিকভাবে ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বেসরকারি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে।

কয়েকটি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত খুব বিপজ্জনক হিসেবে শ্রমসংক্রান্ত জরিপগুলোতে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ওয়েল্ডিং অন্যতম। দেশে এ রকম কারখানার সংখ্যা ২৮ হাজার ২৯০টি। এ কাজে নিয়োজিত শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। মোটরগাড়ির বডি তৈরি ও মোটর ওয়ার্কশপে কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করেন।

দেশে অটোমোবাইল কারখানার সংখ্যা ১৫ হাজার ৬১৪টি। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৫০ হাজার। এ ছাড়া হালকা প্রকৌশল শিল্পের ৪০ হাজারেরও বেশি কারখানায় সরাসরি ৬ লাখ মানুষ কর্মরত।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মধ্যে চাতালশিল্প অন্যতম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট রাইস মিলের সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৫০টি। এর মধ্যে ৩৮১টি অটোমেটিক রাইস মিল, ২৮৩টি সেমি-অটোরাইস মিল ও ১৫ হাজার ৬৮৬টি হাসকিং মিল বা ছোট রাইস মিল। আনুমানিক হিসাবে চাতালশিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ নারী শ্রমিক, বাকি ১ লাখ পুরুষ।

এর বাইরে মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ৩ শতাংশ নির্মাণশিল্পে নিয়োজিত। এ খাতে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এ খাতে নারী শ্রমিকই রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি।

গৃহশ্রমে নিয়োজিত রয়েছে দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমশক্তি। ‘শৈশব’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরে প্রায় ৩ লাখ গৃহশ্রমিক নিয়োজিত। তাদের ৮০ শতাংশই নারী।

এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অসংগঠিত এই শ্রমিকদের কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন থাকা প্রয়োজন।
হটনিউজ২৪বিডি.কম/এআর