জাতীয়

এই সুরমা সেই সুরমা!

১১নিজস্ব প্রতিবেদক, হটনিউজ২৪বিডি.কম ৩০ এপ্রিল : শুষ্ক মৌসুমে বরাকের পানি কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। আর সুরমায় দেখা দেয় পানি সংকট। সেই সুরমা এখন ভরা যৌবনে। শুষ্ক মৌসুমে সুরমাকে বরাক থেকে আলাদা করে দেয় মোহনায় সৃষ্ট বালুচর।

সিলেটের জকিগঞ্জের অমশিদে প্রতিবেশী ভারতের সীমানায় বরাক নদীতে সৃষ্ট চরে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা নদীতে দেখা দেয় নাব্যতা। পানি চলে যায় নদীর তলানিতে। থাকে হাঁটু জল। সেই জলে খেলা করে শিশু-কিশোরের দল। পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায় নদী। কেউ বা ধরেন মাছ।

সেই সুরমা এখন পানিতে টয়টম্বুর। উজানের (ভারত) পাহাড়ি ঢলে এখন ভরা যৌবনে সুরমা নদী। কোথাও সুরমার পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপদ সীমার ওপরে।

অসময়ে অতিবৃষ্টি উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে ফাঁপিয়ে (ভরে) উঠেছে সুরমা। আর সেই সঙ্গে বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে দেখা দিয়েছে অকাল বন্যা। এতে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে লক্ষাধিক হেক্টর ফসলি জমি বোরো।

পরিবেশবিদরা বলছেন, উজানে থাকা রাষ্ট্রের পরিবেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য অনুকূলে থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় বছরের পর বছর আমাদের এরকম প্রাকৃতিক দুর্ভোগ পোহাতে হবে। সেই সঙ্গে পরিবর্তন হবে মানুষের জীবন মানের। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে সুরমাকে বরাক থেকে আলাদা করে দেয় মোহনায় সৃষ্ট বালুচর। এতে করে পানিশূন্য হয়ে পড়ে সুরমা। একারণে সিলেট নগর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক এলাকার পানির স্তরও নিচে নেমে যায়। শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয়, তীব্র খাবার পানি সংকট। নলকূপেও ওঠে না পানি।
ফলে, বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় সিলেট সিটি করপোরেশনকেও। অন্যদিকে, চা বাগানেও দেখা দেয় পানি সংকট। এ অবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলন হয়েছে বহুবার।

আর বর্ষা আসার আগেই উজানের পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আগাম বন্যায় নিমজ্জিত হয় ভারত বৃহত্তর সিলেট, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলার অনেক অঞ্চল।

এবারও একই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষকে। সিলেটের ৬টি উপজেলার মানুষ বানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অকাল বন্যার প্রভাবে জমির পাকা ধান তুলতে পারেনি লক্ষাধিক কৃষক। এরমধ্যে সিলেট সদর, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এছাড়া সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ অঞ্চলের একমাত্র ফসল বোরো তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এ অঞ্চলের লক্ষাধিক কৃষক। এ কারণে এসব এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি ওঠেছে জোরেশোরে।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, প্রকৃতিগত ভাবে অকাল বন্যার প্রভাব থেকে রেহাই পেতে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি পেতে নদী খননের বিকল্প নেই।  এখনই নদী খনন করা না হলে এর প্রভাব ব্যাপকতর হবে। শুষ্ক মৌসুমে সিলেট মরুকরণ হবে। আর বর্ষায় থাকবে অকাল বন্যা প্রভাব।

এর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে মনে করেন কাশমির রেজা। তিনি বৃহত্তর সিলেটের বন্যা কবলিত অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকার থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়ার দাবি জানান।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতে অবাদে গাছপালা নিধন ও খনিজ পদার্থ আহরণে মাইন বিস্ফোরণের ফলে পাহাড়ি ঢলে সঙ্গে ভূমিধস হয়। এতে করে ঢলে সঙ্গে নেমে আসা মাটি নদীর তলদেশ ভরাট করে। ফলে অল্পবৃষ্টিতে অকাল বন্যা হয়। পানিতে তলিয়ে যায় নিম্নাঞ্চল।

এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত হলেও প্রচুর সংখ্যক পাহাড়ি গাছপাল পানি শোষণ করে ফলে কম সংখ্যক পানি নেমে আসে। আর বরাক মোহনায় চর সৃষ্টি হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সুরমায় পানি প্রবাহ থাকে না। তাই উভয় সমস্যা নিরসনে সিলেটের নদীগুলো খননের প্রয়োজন-বলেন তিনি।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান, ভূ-তত্ত্ববিদ ড. জহির বিন আলম বলেন, শুষ্ক মৌসুমে আমরা যথেষ্ট পানি পাওয়ার কথা থাকলেও পাচ্ছি না। যেকারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকদের জীবন যাত্রার মান পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ভাবেই ক্ষতি হচ্ছে। বিপর্যয় ঘটছে পরিবেশেও।

তবে, অতিবৃষ্টির কারণে অকাল বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না-বলেন তিনি। অবশ্য এক্ষেত্রে প্রতিবছর নদী খনন করলে কিছুটা হলেও অকাল বন্যার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা যাবে বলে মত দেন তিনি।
হটনিউজ২৪বিডি.কম/এআর