খুলনা জাতীয় যশোর লাইফ স্টাইল

বেদেদের ডাকে এখনো মানুষ আসে

e19b448a-eb50-448c-99ea-714e78c55cc1যশোর থেকে আব্দুল ওয়াহাব মুকুল: ‘মাজা, হাঁটু, গিট্টা-গাটনের ব্যথা না-মা-ই, মাথার বিষ (মাথাব্যাথা) ঝা-ড়া-ই, দাঁতের পোকা খ-সা-ই।
তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে গোটা পৃথিবী যখন মানুষের হাতের মুঠোয় তখনো গ্রামবাংলার পথে পথে ঝাড়ফুঁক ব্যবসায়ীদের এ হাঁকডাক শোনা যায়। এখনো কিছু মানুষ তাদের মন্ত্রতন্ত্রে বিশ্বাস করে। বাত ব্যথা, মাথাধরা, দাঁতের পোকাসহ নানা ধরনের অসুখ-বিসুখে তাদের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেয় টাকা-পয়সা, চাল-ডাল প্রভৃতি। তবে দিন বদলের সাথে সাথে তাদের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে।
এই ঝাড়ফুঁক ব্যবসায়ীদের পরিচিতি দুটো। একটি বেদে, অন্যটি টুলে। তাদের জীবনযাত্রা বা পেশা ভিন্ন। বেদে বা টুলেরা ১০-১২ টি সপরিবারের একটি গ্রুপ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়। যতদিন ব্যবসায় ভালো চলে ততদিন সেখানে থাকে। তারপর আবার যায় অন্য জায়গায়। এক স্থানের স্থায়িত্ব হয় মাত্র মাসখানেক। ঝাড়ফুঁক তাদের ব্যবসায়।
এই বেদেরা বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। পল্লী কবি জসিমউদ্দিনের ‘বেদের মেয়ে জ্যোসনা’ এক সাড়া জাগানো নাটক। এ নাটকে তিনি বেদেদের জীবনচিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। আর হাট-বাজারে সুর করে গেয়ে বিক্রি করা সেই পুরনো দিনের ‘জরিনার কবিতা’য় বেদের মেয়ে জরিনার প্রেম উপাখ্যানতো তুলনাহীন। কবিতায় অপূর্বা সুন্দরী বেদের মেয়ে জরিনার সৌন্দর্যের বর্ণনা এ ভাবে দেয়া হয়েছে, জরিনার বয়স ষোল/হাতে ছিল প্লাস্টিকের চুরি/গলায় ছিল পুঁতির মালা পরণে জাম শাড়ি/বরণ কাচা সোনা/বরণ কাচা সোনা/হাত দুখানা লাউ লতিকার ডগা/ভুরুতে বিজলী মাখা চাউনি স্বপন আঁকা/ ঠোটে মধু মাখা/ ঠোটে মধু মাখা/আকাবাকা পথ ধরিয়া চলে/ভ্রমর কাজল আউলা কেশ পেছনে দুলতেছে যেন মধুর চাক/ যেন মধুর চাক দেখলে অবাক মুনির মন হরে।
আলাপ হলো এই বেদে বা টুলে আলমাস, এমরান ও হাজেরার সাথে। তারা তাঁবু গেড়েছিল যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার কীর্তিপুর গ্রামে, যশোর-বেনাপোল সড়কের পাশে হযরত জমির শাহ’র (বুড়োর দরগাহ) এর মাজারের উত্তর পাশে। তাঁবু গাড়ার কথা হলেও তাঁবু কেনার পয়সা তাদের নেই। তারা কোনো রকমে থাকার মতো ঘর নামের একটা খুপরি বানিয়ে নেয় পলিথেন দিয়ে। আর সেই খুপরিতে থাকে বউ-ছেলে-মেয়েসহ এক পরিবারের ১০-১২ জন পর্যন্ত।
আলমাস ও হাজেরা ঝাড়ফুঁক করে বেড়ায়। ওরাল মাছের কাটা, কুমিরের চামড়া আরো কী সব মরা জীব-জন্তুর হাড়গোড় আর শেকড়-বাকলের স্তুপ দেখিয়ে আলমাস বললো, আল্লাহর জমিনে দোয়া-দাওয়া দুই-ই আছে। চিনে ব্যবহার করতে পারলে রোগ-ব্যারামে আরাম আসে।
তাদের সাথে থাকে বানর ও সাপ। তারা বানরের নাচ ও সাপের খেলা দেখিয়ে টাকা আয় করে। অনেক জায়গায় আবার বানর দিয়ে মানুষের হাত গোনায়। অন্ধ বিশ্বাসে অনেক অসচেতন মানুষ রোগ মুক্তির জন্য বানর দিয়ে হাত গুনিয়ে বেদেদের কাছ থেকে ওষুধপত্রও নেয়।
সে জানায়, প্রতিদিন তার আয় ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা। সে বনজঙ্গল থেকে সাপও ধরে। কারো বাড়ি থেকে একটি সাপ ধরতে পারলে ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বখশিস পায়। পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়েসহ স্বামী-স্ত্রী মিলে ১০ জনের সংসার চলে এ আয় দিয়েই।
এমরানের পেশা ভিন্ন। সে নিজের পরিচয় দিল ডুবুরি বলে। এ পরিচয়ে তারএকটি সাইনবোর্ডও আছে। গাঁ-গঞ্জে বউ-ঝিরা গোসল করতে গেলে অনেক সময় গয়না-গাটি পানিতে পড়ে যায়। এমরান এসব পানির মধ্য থেকে খুঁজে আনে। হারিয়ে যাওয়া গয়নার মূল্য অনুযায়ী চুক্তি অনুয়ায়ী চুক্তি করে পারিশ্রমিক পায়। এ ক্ষেত্রে পারিশ্রমিকের সাধারণ হিসাব হলো শতকরা ২৫ ভাগ।
সে জানায়, এখন আর সচরাচর গয়না হারায় না। এতে তার আয় কমে গেছে। তাই ডুবুরি কাজের সাথে ভ্রাম্যমাণ মনোহরীর ব্যবসায় করে। প্রতিদিন আয় হয় ১০০ টাকা থেকে।
বেদেদের ওষুধে বা ব্যবস্থায় কারো রোগব্যাধি সেরেছে বলে শোনা যায় না। ভুক্তভোগী অনেকেই জানান, বাত ব্যথা চিকিৎসার নামে তারা রক্ত বের হওয়ার মতো কেটে চোঙা দিয়ে ঢেকে দেয়। কিছুক্ষণ পরে চোঙা সরিয়ে রোগীকে বলে ‘দেখো তোমার শরীরের রক্ত কালো হয়ে গেছে। এ জন্য ব্যথা করে। কুরক্ত বের করে দিলাম। আর ব্যথা করবে না।
প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে শরীর থেকে রক্ত বের হওয়ার বেশ কিছু পর কালো হয়ে যায়। সরলপ্রাণ সাধারণ মানুষ এটি বোঝে না বলেই বেদেদের টাকা দেয়। এমনিভাবে চিকিৎসার নামে তাদের চালাকি ব্যবসায় চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
বেদেদের অনেকে আবার অপরাধের সাথেও জড়িত। তারা গ্রামে ঘোরার সময় আগ্রহী রোগী পেলে তাদের আস্তানায় গিয়ে ওষুধ আনতে বলে। কেউ যদি এ ফাঁদে পা দেয় তাহলে তাকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ফিরতে হয়। ভুক্তভোগী এক ব্যক্তি জানান, তিনি একবার এক বেদের ফাঁদে পড়েছিলেন। তিনি বেদেদের আস্তানায় গেলে ওই বেদে তাকে খুব যত্ন-খাতির করে বসতে দেয়। ঝাড়ফুঁক করে শেকড়- বাকল দিয়ে কিছু টাকা-পয়সাতো নেয়-ই, সেই সাথে তার পরণের ভালো লুঙ্গিটা নিয়ে একটি পুরনো লুঙ্গি পরিয়ে দেয় এবং গায়ের গেঞ্জিটাও নিয়ে নেয়। ভুক্তভোগী ওই লোকটি লুঙ্গি গেঞ্জি দিতে অস্বীকার করলে বেদে তার ডালি থেকে একটি জাতসাপ (পদ্মগোখরো) বের করে লোকটির গলায় পেচিয়ে দিয়ে বলে লুঙ্গি গেঞ্জি না দিলে এই সাফ দিয়ে তাকে ছোবল মারানো হবে। লোকটি এই পরিস্থিতিতে বেদের চাহিদা পুরন করে পালিয়ে বাঁচে।
অপরাধ ও প্রতারণার ঘটনা আরো আছে। গ্রামে যে সব বেদেনী ঘুরে বেড়ায় তারা কোনো মহিলাকে পটাতে পারলে নানান ছালে ছুতায় চাল ডাল টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়ে বিছানাপত্রও নিয়ে যায়। বিছানা নেয়ার কৌশল হলো, তারা ঝাড়ফুঁক দেয়ার আগে বলে একটা বিছানা পেতে বসতে হবে। গ্রামের মহিলারা অনেকটা সহজ সরল প্রকৃতির। বেদেনীর কথা অনুযায়ী বিছানা পেতে বসতে দিলে চিকিৎসা নামের অপচিকিৎসা দিয়ে বিছানাটি ওই বেদেনী নিয়ে নেয়। এতে মহিলা আপত্তি করলে বেদেনী বলে এই বিছানা তোরা ব্যবহার করতে পারবিনে। কারণ ঝাড়ফুঁকের সময় সব রোগ বালাই বিছানায় নেমে আটকে আছে। এই বিছানা বাড়িতে রাখলে এখান থেকে আবার তোদের আক্রমণ করবে।
তবে এ কথাও ঠিক যে এ ধরনের প্রতারণার দিন শেষ হয়েছে। মানুষ আগের চেয়ে চালাক চতুর হওয়ায় প্রতারণা বা অপরাধ করে বেদেরা আর পার পায় না।
বেদেরা কিন্তু বাস্তুহারা বা ছিন্নমূল নয়। বিভিন্ন স্থানে তাদের ভিটেমাটি আছে। আসলাম এমরানরা বিক্রমপুরের বাসিন্দা। তবে জায়গা জমি চাষাবাদ বা অন্য কোনো পেশা তাদের নেই। পুরুষানুক্রমে তারা দেশ ঘুরে এ কাজই করে। ঈদ ও ভোটের সময় তারা বাড়ি ফেরে।
গ্রাম-গঞ্জে বেদেদের ঝাড়ফুঁকের কদর আগের মতো নেই। মানুষ যত শিক্ষিত হচ্ছে ততই এ সবের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। আলমাস জানায়, শিক্ষিত মানুষ তাদের ডাকে না। তাদের দেখাদেখি অশিক্ষিত লোকজনও দোয়া-কবজ নেয়া কমিয়ে দিয়েছে। সাপের উপদ্রবও আগের মতো নেই। এখন আর সচরাচর মানুষের ঘরে সাপও ওঠে না। এ জন্য সাপ ধরে যে পয়সাটা আয় হতো তাও আর হয় না। এ জন্য রোজগার আর আগের মতো হচ্ছে না। পেশা ছেড়ে দিতে মন চায়। তবে পুঁজিপাটা না থাকায় অন্য কোনো কাজে যেতে পারছে না তারা।
সে আরো জানায়, বেদেদের অনেকেই পেশা বদল করেছে। কারণ দিনবদলের সাথে সাথে কষ্টের এ জীবনের প্রতি বেদেরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। বেদে জীবনের একটা বড় সমস্যা হলো তারা লেখাপড়ার সুযোগ পায় না। তারা পথেই জন্মগ্রহণ করে, পথেই বড় হয়। কোনো জায়গায় স্থায়ীভাবে থাকে না। আর এ কারণে তাদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগও নেই। পেশা বদলের সুযোগ পেলে তাদের যাযাবর জীবনের অবসান হবে। শিক্ষা-দীক্ষায় তারা হবে সভ্যসমাজের মানুষ। এ অভিব্যক্তি প্রকাশ করে হাজেরা, আলমাস ও এমরান।

‌‌‌‌