জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর সারাদেশ

ঝব্বু খানম জামে মসজিদে বসে ‍মুয়াজ্জিনকে হত্যার ষড়যন্ত্র

IMG_20160420_1228001461141686 নিজস্ব প্রতিবেদক :  রাজধানীর ইসলামপুরে ঝব্বু খানম জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেনকে (৪৯) হত্যার পূর্বে কেরানীগঞ্জে একটি মসজিদে বসে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার পর মূল হোতা খাদেম হাবীব ঘটনার দুই দিন আগে ছুটি নিয়ে দুদিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে যান। কেউ যাতে টের না পায় এ জন্য ছুটিতে থাকা অবস্থায় আবার ঢাকায় ফিরে এসে মুয়াজ্জিন হত্যাকাণ্ড ঘটান ।

বুধবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লালবাগ বিভাগের উপ কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

তিনি জানান, মুয়াজ্জিন হত্যার সঙ্গে যে পাঁচজন জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। আর বাকী একজন পলাতক রয়েছেন। গ্রেফতারকৃত চারজন হলেন, ঝব্বু খানম জামে মসজিদের খাদেম হাবীব, দ্বিতীয় মুয়াজ্জিন মোশারফ হোসেন, বেলালের বন্ধু সরোয়ার হালিম এবং হাবীবের বন্ধু তোফাজ্জল।

উপ কমিশনার বলেন, ‘মুয়াজ্জিন বেলাল গত ২৮ বছর ধরে ওই মসজিদে চাকরি করেন। মসজিদের নীচ তলায় ৩৩টি দোকানের ভাড়া তুলতেন তিনি। দান বাক্স থেকে কিছু টাকা আসতো। আশপাশের আরো বিভিন্ন দান খয়রাতও তুলে তিনি তার কাছে রাখতেন। প্রতিমাসে ভাড়া বাবদ প্রায় ৪৫ হাজার টাকা উঠাতেন। মসজিদের কোন কমিটি না থাকায় মসজিদের কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার পর বাকী টাকা নিজের কাছেই রাখতেন। মুয়াজ্জিন সব মিলিয়ে ভালো টাকা আয় করতেন। কমিটি না থাকায় কেউ তদারকি করতো না। তাই টাকাগুলো তার নিজের একাউন্টে রাখতেন। কিছু টাকা বন্ধুদের মাধ্যমে সুদের ওপর খাটানো এবং কিছু টাকা শেয়ার বাজারে খাটানোর জন্য বন্ধুকে দিয়েছিলেন।

উপ কমিশনার বলেন, ‘আসামিদের কারোরই বেতন গত তিন বছরে বাড়েনি। তাই আসামিরা চিন্তা করেন, মুয়াজ্জিন বেলালকে মেরে ফেলতে পারলে তাদের সুবিধা হবে। এজন্য তারা দুই বছর আগে পরিকল্পনা করেন এবং দুই বার মারার প্রস্তুতি নিয়েও ব্যর্থ হন। সর্বশেষ ঘটনার দুইদিন আগে হাবীব ২ এপ্রিল ২ দিনের জন্য ছুটি নিয়ে নড়াইলে গ্রামের বাড়ি যান। কেউ ‍যাতে তাকে সন্দেহ না করে সে জন্য তিনি নড়াইলে গিয়ে আবার ৩ এপ্রিল ঢাকায় এসে কেরানীগঞ্জে এক বন্ধুর ওখানে ওঠেন। এই বন্ধুও হত্যা পরিকল্পনাকারীদের একজন। বন্ধুর সঙ্গে তিনি একটি মসজিদে নামাজ পড়েন। সবশেষ রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঝব্বু খানম জামে মসজিদে আসেন। যে সময় হাবীব মসজিদে আসেন ওই সময় বেলাল মসজিদের বাইরে ছিলেন।

মোশারফের সঙ্গে যোগসাজশ করে হাবীব দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মাঝখানে সিড়ি বরাবর অবস্থান নেন। মসজিদের তৃতীয় তলাতেই সবাই রাতে ঘুমান। মুয়াজ্জিন বেলাল রাতে ফিরে যখন ঘুমানোর জন্য সিড়ি দিয়ে তৃতীয় তলায় উঠছিলেন ঠিক তখনি হাবীব ধারাল ছুরি দিয়ে পেছন থেকে কয়েকটি আঘাত করেন। এরপর তার হাত ও মুখ চেপে ধরেন। এক পর্যায়ে বেলাল নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে সিড়িতে ফেলে দিয়ে তার পকেট থেকে ছয় হাজার টাকা ও চাবির গোছা নিয়ে মোশারফের বিছানায় যান।

সেখানে মোশারফকে দুই হাজার টাকা ভাগ দিয়ে হাবীব আবার কেরানীগঞ্জে চলে যান।

হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারীরা পালিয়ে গেলেও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের সনাক্ত করা হয়। এরপর হাবীবকে নড়াইল, মোশারফকে নেত্রকোণা, তফাজ্জল হোসেনকে কেরানীগঞ্জ এবং সরোয়ার হালিমকে কোতয়ালীর ইসলামপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। বাকী একজনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডে যে ছুরিটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি হাবীবের দেওয়া তথ্যমতে বাবুবাজার ব্রীজের নিচে একটি ড্রেন খেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ওই ছুরিটি ঘটনার দুই মাস আগে চকবাজারের একটি দোকান থেকে কেনেন।

এক প্রশ্নের জবাবে উপ কমিশনার বলেন, ‘সরোয়ার হালিম বেলালের বন্ধু। এর আগে বেলাল ৮ লাখ টাকা তাকে দেন শেয়ার বাজারে খাটানোর জন্য। এই টাকা যাতে ফেরত দিতে না হয় সে জন্য মোশারফের সঙ্গে বেলালকে হত্যায় যোগ দেন সরোয়ার হালিম। মসজিদের পাশেই নিজের বাসায় থাকেন সারোয়ার হালিম।

হাবীব কেন খুন করেছেন জানতে চাইলে মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তিনি খুন করলে টাকা পাবেন, মুল মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পাবেন, মসজিদের আর্থিক কর্তৃত্ব পাবেন। এসব কারণে তিনি হত্যাকান্ড ঘটাতে পরোচিত হন। অর্থাৎ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আর্থিক লোভের জন্যই মুয়াজ্জিন বেলালকে খুন করা হয়।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে উপ কমিশনার বলেন, ‘আসামি এর আগে হেফাজতে ইসলাম-এর সঙ্গে নানা কর্মকান্ডে সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রিমান্ডে এনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর কারো সঙ্গে যোগসাজস আছে কি না তা জানা যাবে।’

প্রসঙ্গত, গত ৪ এপ্রিল ভোরে পুরান ঢাকার ঝব্বু খানম জামে মসজিদের ইমাম তাজুল ইসলাম নামাজ পড়ানোর জন্য দোতলায় গেলে মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।