জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর

পদ্মা নদীর তীর সংরক্ষন কাজে ব্যাপক অনিয়ম

shariatpur padma Rivar pic (2)মোঃ বোরহান উদ্দিন রব্বানী, শরীয়তপুর:শরীয়তপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে জলবাযু পরিবর্তন ট্রাষ্ট এর অর্থায়নে শুরু হয়েছে ১২ কেটি টাকা ব্যায়ে ২ কিলোমিটার পদ্মা নদীর তীর সংরক্ষন বাধ। ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে কোন রকমে বালুর বস্তা ফেলে কাজ শেষ করছে ঠিকাদার নামের আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা। এলাকাবাসী ধারনা করছে যে মানের কাজ করা হচ্ছে তাতে চলতি বর্ষা মৌসুম শেষ না হতেই ভেসে যাবে এই বালুর বাধ। রক্ষা পাবে না নদী ভাঙ্গন।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ এপ্রিল জেলার নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর দরবারের পশ্চিম দিক থেকে চন্ডিপুর লঞ্চঘাট পর্যন্ত ভাঙ্গন কবলিত পদ্মা নদীর ২ কিলো মিটার তীর সংরক্ষনের কাজরে দরপত্র আহবান করা হয়। ২’শ ৫০ মিটার করে ৮টি প্যাকেজের মাধ্যমে ২ কিমি ব্যাপী ঘানি ব্যাগ ও জিইও টেক্সটাইল ব্যাগে বালু ভর্তি করে অস্থায়ী ভিত্তিতে ¯্রােতশ্বনী প্রমত্তা পদ্মার ভাঙ্গন রোধ করার জন্য এই দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্র আহবানের পর ২৪ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের শরীয়তপুর সদর শাখাকে প্রতি প্যাকেজের বিপরীতে ৪০টি করে মোট ৩২০টি সিডিউল বিক্রির দায়িত্ব দেয়া হয়। সোনালী ব্যাংক থেকে ঠিকাদারগন ১৯২ টি সিডিউল ক্রয় করেন। ৩০ এপ্রিল ছিল সিডিউল জমার শেষ তারিখ। ওই দিন অনেক ঠিকাদার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে সংরক্ষিত টেন্ডার বাক্সে সিডিউল জমা দিতে এসে বাধার মুখে পরেন। তারা সরকার দলীয় বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের বাধার কারনে সিডিউল জমা দিতে পারেননি।
এই উন্নয়ন কাজটি শরীয়তপুর-২ সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার হওয়ায় ওই এলাকার সংসদ সদস্যের নিজস্ব আত্মীয় স্বজন ও দলীয় কর্মীদের ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহন করে জেলা আ’লীগের সভাপতি। কিন্ত জেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ুন মোল্লা এবং জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বেকে বসায় তাদের দু’টি কাজ ছাড় দিয়ে বাকি ৬ টি কাজ দেয়া হয় ওই সাংসদের পছন্দের লোকদের। কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের কেউ কেউ আবার উচ্চ মূল্য পেয়ে বিক্রি করে দেয় অন্য ঠিকাদারদের কাছে। জেলা আ’লীগের সভাপতির নেতৃত্বে নির্ধারিত ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে নেগোসিয়েশন (নিকো) বোর্ডকে দিতে হয়েছে ৬% টাকা। যার মধ্যে ১% টাকা রাখা হবে নির্মানাধীন জেলা আ’লীগের অফিসের কাজ শেষ করার জন্য।
সদর উপজেলার চন্দ্রপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর শিকদার বলেন, আমি ৮টি প্যাকেজের বিপরিতেই সিডিউল ক্রয় করেছিলাম। কিন্তু আ’লীগ নেতৃবৃন্দ আমার সিডিউল জমা দিতে দেয়নি এমনকি আমার সিডিউলের টাকাও ফেরত দেয়নি। আমি জেলা আ’লীগের সভাপতিকে আমার সিডিউলে টাকা ফেরত চেয়ে কয়েকবার ফোন করলে তিনি জানিয়েছেন এখনো নিকো বোর্ডের টাকা হাতে আসলে আপনার পাওনা বুঝিয়ে দেয়া হবে।
প্রতি প্যাকেজে ৫০ হাজার করে চটের তৈরী ঘানি ব্যাগ ও ২০ হাজার করে জিইও টেক্সটাইল ব্যাগে বালু ভর্তি করে নদীর তীর থেকে স্থান ভেদে ১৫-২০ মিটার প্লেসিং ও ওয়াটার লেভেল থেকে ২৫ মিটার গভীরে জিইও ব্যাগ দ্বারা ডাম্পিং করার নিয়ম রয়েছে। প্রতিটি জিইও ব্যাগে ২৫০ কেজি ও ঘানি ব্যাগে ৭৫ কেজি করে বালু ভর্তি করার কথা। এলাকা বাসী জানিয়েছে , অতি পুরনো ও ছেড়াফাড়া চটের বস্তায় ৩০-৪০ কেজি করে বালু ও জিইও ব্যাগে ১৫০-১৬০ কেজি করে বালু ভর্তি করে তা পানিতে ফেলা হচ্ছে। প্রতিটি বস্তা পরিমাপক যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা করে পানিতে ফেলার কথা থাকলেও কয়েকবার সরেজমিনে গিয়ে তা দেখা যায়নি। বড় বড় জাহাজে করে নদী থেকে বালু কেটে এনে সেই ভিজা বালুই বস্তায় ভরে মুখ সেলাই করে নদীতে ফেলা হচ্ছে। ডাম্পিং এর পর ডুবুরী দিয়ে বস্তা যাচাই করার কথা থাকলেও হাজার হাজার বস্তা বালু পানিতে ফেলার পরেও দেখা মিলেনি কোন ডুবুরীর। অথচ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স এর সদস্য এবং স্থানীয় উপসহকারী প্রকৌশলীগন কাজের লোক দেখানো পর্যবেক্ষন করছেন।
চন্ডিপুর এলাকার ভাঙ্গন কবলিত পদ্মা পাড়ের পাঁচগাও গ্রামের তৈয়ব আলী মোল্যা (৭৫), সুমন বেপারী (২৮), কেদারপুর গ্রামের সালাউদ্দিন (৩৮), আছিয়া বেগম (৭০) জানান, ঠিকাদারের লোকেরা ছালার বস্তা ও কম্বল কাটা বস্তায় যেই পরিমানের বালু ভর্তি করে নদীতে ফেলছে তাতে পদ্মার ভাঙ্গন বন্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। তারা কোন বস্তায়ই পুরো ভরাট করে না। তারা আরো বলেন, যে পরিমানের বস্তা পানিতে ফেলার কথা শুনেছিলাম তার অর্ধেকও ফেলছেনা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাব-ঠিকাদার (জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি) জানান, আমরা যারা কাজ ক্রয় করেছি তারা নেগোসিয়েশন বোর্ডকে নির্ধারিত প্রাক্কলন মূল্যের ৬ শতাংশ এবং যাদের কাছ থেকে কাজ ক্রয় করে এনেছি তাদের ৬ শতাংশ টাকা দিতে হয়েছে। এর পরে আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের দিতে হবে কম পক্ষে ৭/৮ শতাংশ টাকা। এর পরে রয়েছে আবার সরকারী ভ্যাট ও টেক্স। দিন রাত কাজ করেও আমরা কুল পাচ্ছি না। ৭০/৮০ ভাগ কাজ শেষ করেছি তার পরেও কোন বিল পাইনি এখনো।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল খালেক বলেন, নির্ধারিত সময় মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। কাজের মধ্যে সামান্য ভুল ভ্রান্তি থাকতে পারে, কিন্তু ডিজাইনের বাইরে গিয়ে কাজে বড় ধরনের অসঙ্গতি করার কোন সুযোগ নেই।