অপরাধ ঢাকা

শেরপুরের এক মহিলা পেশকারের কান্ড

‡bmশেরপুর থেকে শাহরিয়ার আহম্মেদ শাকির: এবার নিজেকে ম্যাজিষ্ট্র্রেট পরিচয় দিয়ে এক আমেরিকা প্রবাসীকে বিয়ে করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন শেরপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্টের এক আলোচিত মহিলা পেশকার। তবে ঘটনা ফাঁস হওয়ায় ভেঙ্গে গেছে তার প্রতারণার সংসার। এখন তার সোনার হরিণ চাকুরিটিও হারানোর অবস্থা।

জানা যায়, শেরপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্টের পেশকার, শহরের চকবাজার এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোঃ লিয়াকত আলীর মেয়ে তালাকপ্রাপ্তা এক সন্তানের জননী সাময়িতা তাসমিন লিনিয়ার সাথে মোবাইল ফোনে কথার সূত্রে পরিচয় হয় ঢাকার মিরপুর থানার শেলটেক শেওড়াপাড়া এলাকার প্রতিষ্ঠিত পরিবারের যুবক, আমেরিকা প্রবাসী জাফর উল্লাহর। পরিচয় সূত্রেই তারা পরস্পর অবগত হয় জাফর উল্লাহ আমেরিকান ইমিগ্রেন্ট প্রবাসী আর সাময়িতা তাসমিন লিনিয়া শেরপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট। সেই পরিচয় থেকে ধাপে ধাপে প্রণয় এবং এক পর্যায়ে বিয়ে। চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল তাদের বিয়ে হয় ঢাকার অভিজাত পাড়ার এক কাজী অফিসে। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন না যেতেই জাফর উল্লাহ টের পেয়ে যান নব পরিনীতা লিনিয়ার পূর্বের বিয়ে ও ঘরে থাকা এক পুত্র সন্তানের কথা। সেই সাথে তিনি খোজ নিয়ে জেনে যান, লিনিয়া কোন ম্যাজিষ্ট্রেট নয়, সে জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্র্রেট আদালতের একজন পেশকার মাত্র। এ নিয়ে নতুন সংসারে শুরু হয় বিভেদ। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত তথ্য ফাঁস হওয়ায় আর প্রতারণার সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকায় ২৫ মে স্বামীর বাসা থেকে নগদ ২ লক্ষ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারসহ স্বামীর আমেরিকার গ্রীনকার্ড, সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড, এটিএম কার্ড, আমেরিকান আইডি কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্রসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে লাপাত্তা হয় লিনিয়া। এরপর মূল্যবান কাগজপত্র ফেরত দিতে ২৭ মে সন্ধ্যায় স্বামী জ্ফার উল্লাহকে মোবাইল ফোনে ঢাকার জিপিও মোড়ে যেতে বলে লিনিয়া। কথামত মূল্যবান কাগজ পত্রগুলো ফেরত পেতে অগত্যা জিপিও মোড়ে চলে যান জাফর উল্লাহ। কিন্তু সেখানে পরিস্থিতি দেখা যায় ভিন্ন। লিনিয়ার সাথে থাকা এক লোক নিজেকে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দেয় এবং জাফর উল্লাহকে ওসমানী উদ্যানে নিয়ে যায়। সেখানে পূর্ব থেকে অবস্থান করা তাদের লোকজন জাফর উল্লাহকে ঘেরাও করে বেধড়ক মারপিটসহ এক পর্যায়ে অপহরণের চেষ্টা চালায়। পরে তার ডাকচিৎকারে কর্তব্যরত পুলিশ ও পথচারীরা এগিয়ে গেলে তারা সটকে পড়ে। ওইসব ঘটনায় জাফর উল্লাহ বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানা ও পল্টন থানায় পৃথক দুটি সাধারণ ডায়েরী করেছেন। সেইসাথে ৯ জুন তালাক প্রদানের মাধ্যমে লিনিয়ার সাথে প্রতারণার সংসার ছিন্ন করেছেন।

এদিকে, ২৬ এপ্রিল থেকে সাময়িতা তাসমিন লিনিয়া বিনা অনুমতিতে তার কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এ বিষয়ে তাকে শোকজ করা হলেও এখনও তিনি কোন জবাব দাখিল করেননি। এখন সহসাই তিনি চাকুরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০২ সনের ১ জুলাই শেরপুর শহরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে ও মেধাবী শিক্ষার্থী এস.এম আতিকুর রহমান আলামিনের সাথে সম্পর্কের সূত্রে বিয়ে হয় তৎকালীন ইডেন কলেজ ছাত্রী লিনিয়ার। শহরে তারা বেশ আলোচিত জুটি হিসেবেই পরিচিত ছিল। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় তাদের ঘরে জন্ম নেয় ফুটফুটে পুত্র সন্তান নিউটন রহমান। কিন্তু অত্যাধুনিকতার ছোয়ায় অতি চটপটে ও উচ্ছৃংখল প্রকৃতির লিনিয়ার সাথে বেশিদিন সংসার টেকেনি হতভাগ্য প্রেমিক আলামিনের। ২০০৭ সালের জানুয়ারীর প্রথমার্ধে অজ্ঞাতনামা বন্ধুর সাথে যৌনাচারের ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে শেরপুরে। ঘটনাটি টক অব দি টাউনে পরিণত হয়। দুই ব্যবসায়ী পরিবারের মান-ইজ্জত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে লিনিয়া স্বামী আলামিনের বিরুদ্ধে যৌতুকের টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে অজ্ঞাতনামা বন্ধুর সাথে যৌন মিলনে বাধ্য করার অভিযোগে শেরপুর সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় আলামিন দুই দফায় প্রায় সাড়ে সাত মাস হাজতবাসের পর জামিনে বেরিয়ে এসে ২০১০ সালের ৩১ মে লাজলজ্জা আর পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থেই তালাক দিয়ে দেন লিনিয়াকে। ওই তালাকের পূর্বেই শেরপুরে জেলা জজের অধীনে চাকরি হয়ে যায় লিনিয়ার। এরপর থেকেই শেরপুরে থাকা মাদ্রকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার সাথে তার অবাধ বিচরণও চোখে পড়ে শহরবাসীর। খবর ছড়ায় তারা আত্মীয়তার সূত্রে নতুন বিবাহিতা। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে, প্রথম স্বামীর বিরুদ্ধে করা যৌতুক সংক্রান্ত ওই মামলাটি দীর্ঘ ৬ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও নিস্পত্তি হয়নি। আজও তা বিচারাধীন থাকায় মামলার পর থেকেই মাসের পর মাস আদালতে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন কলেজ শিক্ষক সাবেক স্বামী এসএম আতিকুর রহমান আলামিন। অন্যদিকে চাকরির সুবাদে একই আদালতের কম্পাউন্ডে অবস্থানের পরও মাসের পর মাস বছরের পর বছর স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন না লিনিয়া কিংবা রাষ্ট্রপক্ষ খোজে পাচ্ছেন না তাকে। গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, জজ আদালতের তৎকালীন এক যুগ্ম জজের সাথে পারিবারিক সম্পর্কের সুবাদে কোর্ট কাচারীতে লিনিয়া ধরাকে সরা জ্ঞান করে আসছিলেন। আইনজীবী, আইনজীবী সহকারী থেকে শুরু করে সিনিয়র স্টাফ ও সমপর্যায়ের কর্মচারীদের প্রতিও রূঢ় আচরণ করেছেন লিনিয়া। অভিযোগের পর অভিযোগেও থামানো যায়নি তাকে। এক পর্যায়ে সম্পর্কের সেই যুগ্ম জজ বদলী হলে তার দাপট-দৌরাত্ম কমতে থাকে। পেশকার থেকে তাকে বসানো হয় অন্য দায়িত্বে। তার সর্বশেষ অবস্থা এখন আদালত অঙ্গনের মুখে মুখে।