কৃষি ঢাকা

লটকন এখন চাষীদের কাছে বাংলার আঙ্গুর ফল

belabo photoশেখ আঃ জলিল বেলাব(নরসিংদী) প্রতিনিধি:এক সময়ের জংলী ফল হিসেবে পরিচিত নরসিংদীর লটকন এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিক ভাবে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে বিক্রি হচ্ছে। আর্থিক ভাবে লাভবান ও প্রচুর চাহিদা থাকায় নরসিংদীর বেলাব,রায়পুরা,মনোহরদী ও শিবপুর উপজেলার চাষীদের মধ্যে লটকনের চাষের ব্যপকতা ও বাগানের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নরসিংদীর উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমের এই চার উপজেলার লালমাটি এলাকা থেকে প্রতিদিন শত শত টন লটকন পাইকাররা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছে। এ এলাকার লটকন যেন বাংলার আঙ্গুর ফল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে কৃষকদের কাছে।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলার বেলাব, শিবপুর, মনোহরদী ও রায়পুরা উপজেলায় প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। মৌসুমে এখানে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন লটকন উৎপাদন হয়, যার আনুমানিক দাম ২৫-৩০ কোটি টাকা।

চাষীরা জনা যায়,লটকন উচ্চ সমতল সব ধরনের জমিতেই জন্মে। আগে গ্রামে গ্রামান্তরের কোন কোন বাড়িতে কদাচিৎ লটকন গাছ দেখা যেত। চাহিদার ব্যাপকতা বা জন সমাদৃতা তেমন ছিলনা বলে কেউ এটিকে বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদনের কথা চিন্তা করত না। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর ক্যালোরি, খাদ্য ও পুষ্টিগুণ সমৃব্ধ এ ফলের চাহিদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে ফলের মূল্যও। মাটি ও জাতগুণে লটকনের মধ্যে টক ও মিষ্টি দুই প্রকারেই পাওয়া যায়। তবে অধিক মিষ্টি ও সামান্য টক স্বাদের লটকনের চাহিদা বেশি। নরসিংদীর উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সু-উচ্চ গৈরিক বা লাল রঙের মাটিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান বিদ্যমান থাকায় এ মাটিতে লটকনের উৎপাদন ভাল হচ্ছে। স্বাদে-গন্ধে হচ্ছে মিষ্টি এবং আকৃতিতেও হচ্ছে বড় বড়। নরসিংদীর রায়পুরা, শিবপুর, বেলাব, মনোহরদী উপজেলার শত শত চাষী বর্তমানে লটকন বিক্রি করে অর্থনৈতিক সাফল্য ফিরিয়ে আনছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শিবপুর উপজেলায় সবচে বেশি লটকনের বাগান রয়েছে। ২০/২৫ বছর আগেও এসব এলাকায় লটকনের নিজস্ব কোন বাগান ছিলনা। বাড়ির অনাবাদি জমি এবং ঝোঁপ জংগলে লটকনের চারা জন্ম হতো।

তখন লটকনের তেমন চাহিদা ছিল না, দামও ছিল কম, যে জন্য কেউ লটকনের নিজস্ব বাগান করার চিন্তা করত না। বর্তমানে চাহিদা ও মূল্য দু’টিই বেড়েছে। অন্যান্য ফলের তুলনায় লটকনের ফলন অনেক বেশি হয় বলে কৃষকরাও অধিক লাভবান হচ্ছে। ফলে একেক এক জন কৃষক তার কয়েক বিঘা জমিতে লটকনের আবাদ করে।

লটকন ফল গাছের কান্ডে ফলে। গাছের পুষ্টির সুষমতা ও আবহাওয়া অনূকূলে থাকলে গাছের গোড়া থেকে প্রধান কান্ড গুলোতে ঝোপায় ঝোপায় এত বেশি ফল আসে যে তখন গাছের কান্ড বা ডাল দেখা যায় না।

চাষীরা আরো জানান, এখন কোয়ালিটি ভেদে লটকন ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা মণ দরে পাইকারী বিক্রি করছেন। ফল বিক্রির ভাবনা তাদেরকে ভাবতে হচ্ছে না। পাইকারা বাগান থেকেই লটকন কিনে নিয়ে যাচ্ছে।

কামরাব গ্রামের নজরুল ইসলাম নামে একজন লটকন চাষী জানান, লটকন গাছে নারী- পুরুষ রয়েছে। ফল আসার আগ পর্যন্ত নারী- পুরুষ চিহ্নিত করা দুষ্কর। চারা লাগানোর কমপক্ষে ৫/৬ বছর পর ফল আসে। ততদিন চাষীদেরকে অপেক্ষার প্রহর গুণতে হয়। পুরুষ গাছ হলে তা কেটে আবার চারা লাগিয়ে ৫/৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়। একারণে প্রথমদিকে চাষীরা লটকন চাষে উৎসাহিত হয়নি। প্রথমদিকে চাষীরা চারার জন্য নার্সারিগুলোর উপর নির্ভর করলেও এখন তারা তা করছে না। এখন নিজেরাই চারা তৈরি করছে। বহু অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে এবং এক বিচি বিশিষ্ট লটকটন থেকে অধিক নারী গাছের জন্ম নেয়। তাছাড়া চারা অবস্থায় গাছের বিভিন্ন লক্ষণ দেখে অভিজ্ঞরা নারী চারা সনাক্ত করতে পারেন। বাছাইয়ের এ পদ্ধতি বিজ্ঞান সম্মত না হলেও চাষীরা বেশ সাফল্য পাচ্ছেন। দেখা গেছে বাগানগুলোতে নির্দিষ্ট দূরত্বে ৩টি করে চারা রোপণ করা হচ্ছে। ৪/৫ বছর পর প্রথম ফল এলে নারী গাছ রেখে বাকীগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে ৫ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। অন্য কোন ফলে সাধারণত এত টাকা চাষীদের আয় হয় না।

নরসিংদীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মুকছেদ আলী বলেন, লটকন চাষে রোগ বালাই তেমন একটা নেই। চাহিদাও প্রচুর, এসব কারণেই দিন দিন নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় লটকন চাষের প্রসার ঘটছে। এছাড়া দেশের পাশাপশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে এখানকার লটকনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।